
ছবি : সংগৃহীত
নিজস্ব প্রতিনিধি। পর্যটন সংবাদ : শীত মৌসুম এলেই দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি নতুন প্রাণ ফিরে পায়। কুয়াশামাখা ভোরে হাওরের জলরাশির ওপর ভেসে ওঠে শীতের অতিথি পাখির দল। চলতি মৌসুমে হাকালুকি হাওরে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। এই দৃশ্য দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই ভিড় করছেন প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটক ও আলোকচিত্রীরা। তবে এই আনন্দের ছবির আড়ালেই তৈরি হচ্ছে উদ্বেগজনক বাস্তবতা—অসাধু চক্রের হাতে অবাধে শিকার হচ্ছে এসব অতিথি পাখি।
স্থানীয়রা জানান, নভেম্বরের শেষ দিক থেকেই হাকালুকি হাওরের বিভিন্ন বিল ও জলাভূমিতে বালিহাঁস, সরালি, পাতিহাঁস, গিরিয়াসহ নানা প্রজাতির পাখির আনাগোনা বাড়তে শুরু করে। সপ্তাহান্তে হাওরের পাড়ে ও নৌপথে পর্যটকদের ভিড় চোখে পড়ে। অনেকেই নৌকা ভাড়া করে পাখি দেখার উদ্দেশ্যে ভোর কিংবা বিকেলে হাওরের ভেতরে প্রবেশ করছেন।
ঢাকা থেকে আসা এক পর্যটক বলেন, “হাকালুকি হাওরে পাখির দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ। এত কাছ থেকে শীতের অতিথি পাখি দেখার সুযোগ খুব কম জায়গায় আছে। কিন্তু কিছু জায়গায় মৃত পাখির খবর শুনে মন খারাপ হয়ে গেছে।”
পর্যটনের এই বাড়তি উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও, একই সঙ্গে সুযোগ নিচ্ছে অসাধু শিকারিরা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পর্যটকদের আনাগোনার সুযোগে কিছু এলাকায় রাতের বেলা কিংবা লোকচক্ষুর আড়ালে জাল ও ফাঁদ পেতে পাখি ধরা হচ্ছে। পরে সেগুলো স্থানীয় বাজারে কিংবা গোপনে বিক্রি করা হচ্ছে।
হাওরপাড়ের এক বাসিন্দা বলেন, “পর্যটক আসায় আমাদের নৌকা ভাড়া, দোকানপাট ভালো চলছে। কিন্তু কিছু মানুষ পাখি মেরে বিক্রি করছে। এতে হাওরের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।”
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, হাকালুকি হাওর এখন শুধু জলাভূমি নয়, এটি একটি সম্ভাবনাময় প্রকৃতি পর্যটন কেন্দ্র। শীতের অতিথি পাখিকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত ইকো-ট্যুরিজম গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু পাখি শিকার চলতে থাকলে পর্যটকরাও আগ্রহ হারাবে।
এক পরিবেশবিদ বলেন, “পরিযায়ী পাখি দেখতে পর্যটক আসা ভালো লক্ষণ। এতে মানুষ প্রকৃতির প্রতি আগ্রহী হয়। কিন্তু যদি শিকার বন্ধ না হয়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই পাখির সংখ্যা কমে যাবে, পর্যটনও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “শীতের অতিথি পাখি শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমরা হাওর এলাকায় টহল জোরদার করেছি। বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, পর্যটকদেরও সচেতন হতে হবে। “কেউ পাখি শিকারের ঘটনা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, “হাকালুকি হাওরে পর্যটন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু পাখি নিধন চললে এই সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা চাই হাওর বাঁচুক, পাখি বাঁচুক।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতের অতিথি পাখি শুধু সৌন্দর্যই নয়, হাওরের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে এসব পাখির অবদান রয়েছে।
সব মিলিয়ে, হাকালুকি হাওরে শীতের অতিথি পাখির আগমন যেমন পর্যটকদের টানছে, তেমনি অসাধু শিকারিদের লোভও বাড়াচ্ছে। প্রশাসনের নজরদারি, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং স্থানীয় মানুষের সচেতন অংশগ্রহণই পারে এই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে একসঙ্গে রক্ষা করতে।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



