ইন্ডিগোর ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল: চারদিন ধরে অচলাবস্থা, যাত্রীদের ক্ষোভ চরমে

ইন্ডিগো

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ভারতের শীর্ষ বাজেট এয়ারলাইনে একের পর এক ফ্লাইট বাতিলের ধাক্কায় শুক্রবার কয়েকটি বড় বিমানবন্দর কার্যত স্থবির হয়ে যায়। ভোর থেকেই যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ফ্লাইট পরিচালনার নিয়ম, ক্রু সংকট আর শীতকালীন সীমাবদ্ধতার জটিলতায় ইন্ডিগো এখন দেশের বিমান পরিবহন ব্যবস্থার কেন্দ্রে বড় এক অস্থিরতার প্রতীক।

এএফপির তথ্য বলছে, নতুন নিরাপত্তা বিধিমালা মানতে গিয়ে ইন্ডিগো শুক্রবারই ৫৫০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে। আগের তিনদিন ধরেও দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরে একই ধরনের অচলাবস্থা চলছিল। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে বিমান সংস্থাটি স্বয়ং ডিরেক্টরেট জেনারেল অব সিভিল অ্যাভিয়েশন (DGCA)–কে জানিয়েছে, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত তাদের সময় লাগতে পারে কার্যক্রম পুরোপুরি স্থিতিশীল করতে।

বড় শহরগুলোতে একের পর এক বাতিল

দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ—ভারতের চারটি ব্যস্ততম শহরেই বিপর্যয় ছিল চোখে পড়ার মতো। শুধু বৃহস্পতিবারই দিল্লিতে ৯৫টির মতো, মুম্বাইতে ৮৫টি, হায়দরাবাদে ৭০টি এবং বেঙ্গালুরুতে প্রায় ৫০টি ফ্লাইট বাতিল হয়।

শুক্রবার পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দিল্লির আইজিআই বিমানবন্দরে অন্তত ১৩৫টি যাত্রা এবং ৯০টি আগমন বাতিল ঘোষণা করা হয়। পুনে বিমানবন্দর অতিরিক্ত কর্মী এনে যাত্রীদের সহায়তা করার ব্যবস্থা করলেও বিশাল ভিড় সামলানো যে কতটা কঠিন—তা现场েই বোঝা যাচ্ছিল।

দেশটির অভ্যন্তরীণ রুটের ৬০ শতাংশের বেশি দখলে রাখা ইন্ডিগোর জন্য এই বিপর্যয় বড় এক ধাক্কা। যে ব্র্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে সময়ানুবর্তিতা নিয়ে গর্ব করত, সেই ব্র্যান্ডেই এখন দিনের পর দিন যাত্রীদের চরম অনিশ্চয়তায় পড়তে হচ্ছে।

কোথায় মূল সমস্যা?

ডিজিসিএর জরুরি পর্যালোচনা বৈঠকে চারটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে—

  • নতুন FDTL বিধিমালার দ্বিতীয় ধাপে অভিযোজনের সমস্যা
  • ক্রু তালিকা প্রস্তুতিতে ভুল
  • শীতকালীন সময়সূচীর সীমাবদ্ধতা
  • রাতের ফ্লাইটে অতিরিক্ত চাপ

এতদিন চালু থাকা নিয়ম বদলে জুলাই ও নভেম্বর ২০২৫-এ নতুন ক্লান্তি–ব্যবস্থাপনা নীতি চালু হয়েছে। ইন্ডিগো স্বীকার করেছে, তারা ক্রু চাহিদার হিসাব ভুল করেছিল। ফলাফল—প্রতিদিন ১৭০ থেকে ২০০টি ফ্লাইট বাতিল করতে হয়েছে, যা তাদের স্বাভাবিক মাত্রার অনেক বেশি।

যাত্রী-পরিচালনায় বড় ঘাটতি

ডিজিসিএর কর্মকর্তারা বিমানবন্দর পরিদর্শনে গিয়ে আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় দেখেছেন। যাত্রী–পরিচালনার কর্মী সংখ্যা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। হঠাৎ বাতিল আর ঢালাও সময়সূচী পরিবর্তনে যাত্রীদের ভিড় বাড়লেও সেসব সামলানোর মতো সাপোর্ট টিম কেন জোরদার করা হয়নি—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠেছে।

যাত্রীদের অনেকেই জানিয়েছেন, তারা সময়মতো তথ্য পাচ্ছেন না। কেউ রাত ৫টা থেকে অপেক্ষা করছেন, কেউ চেক-ইন লাইনে দাঁড়িয়ে ১৫–২০ মিনিট পর জানতে পারছেন সব ফ্লাইট বাতিল। হতাশা জমে ক্ষোভে পরিণত হয়েছে—সামাজিকমাধ্যমেও তা স্পষ্ট।

অপারেশন স্থিতিশীল করতে নতুন রোডম্যাপ

ডিজিসিএ ইন্ডিগোকে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা দিতে বলেছে। এতে থাকতে হবে—

  • নতুন বিমান যুক্ত হলে কত ক্রু লাগবে তার সঠিক হিসাব
  • ক্রু প্রশিক্ষণের হালনাগাদ কাঠামো
  • তালিকা পুনর্গঠন
  • নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন
  • দুই সপ্তাহ অন্তর অগ্রগতি প্রতিবেদন

অন্যদিকে ইন্ডিগো নতুন FDTL নিয়মের জন্য ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত অস্থায়ী ছাড়ও চেয়েছে।

সরকারও নেমেছে মাঠে

অবস্থা যে গুরুতর—সেটা বুঝতে পেরেই বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে।

  • বিঘ্ন দ্রুত স্বাভাবিক করা
  • ভাড়া বৃদ্ধি বন্ধে নজরদারি
  • আগাম ফ্লাইট–বাতিল বিজ্ঞপ্তি বাধ্যতামূলক করা
  • যাত্রী আটকে গেলে হোটেল ও সহায়তা নিশ্চিত করা

বিমানবন্দর পরিচালকদের প্রতিনিয়ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

কী বলছেন ইন্ডিগোর সিইও?

পিটার এলবার্স স্বীকার করেছেন যে প্রতিষ্ঠানটি এখন বড় এক অপারেশনাল সঙ্কটের মধ্যে আছে। তাঁর দাবি—সময়সূচী পুনরুদ্ধার করা সহজ নয়, তবে অগ্রাধিকার এখন পরিষেবা স্থিতিশীল করা। তিনি যাত্রীদের কাছে আবারও ক্ষমা চেয়েছেন।

এয়ারলাইনটি জানিয়েছে, তারা মন্ত্রণালয়, ডিজিসিএ, এএআইসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে চাপ কমাতে এবং পরিস্থিতি সামলাতে।

এখনকার বাস্তব পরিস্থিতি

ইন্ডিগো আগামী সপ্তাহ থেকেই সময়সূচী সীমিত করতে চলেছে। ফলে বাতিলকরণ আরও কয়েকদিন চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যাত্রীদের ভ্রমণের আগে ওয়েবসাইটে স্ট্যাটাস পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

এক কথায় বললে, ভারতের সবচেয়ে বড় এয়ারলাইনের এই অচলাবস্থা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার ভুল নয়—এটি দেশের বিমান পরিবহন খাতেরই বড় এক সতর্কবার্তা। নিয়ম পরিবর্তন, ক্রু নিরাপত্তা, শীতের সীমাবদ্ধতা—সব কিছুর মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে, অস্থিরতা এভাবেই যাত্রীদের কাঁধে এসে পড়ে।

Read Previous

হর্নবিল উৎসবে তিন দিনে দর্শকের স্রোত — ছুঁলো ৬০ হাজারের মাইলফলক

Read Next

মধ্যপ্রাচ্য রুটে ভাড়া দাবি নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে বিমান: প্রবাসীরা বলছেন বাস্তবতা আলাদা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular