
ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন বিভাগ নিয়ে বহুদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছিল। যাত্রীদের অভিযোগের তালিকায় ছিল ঘুষের চাপ, জাল নথির মাধ্যমে ভ্রমণের সুযোগ, আর ভেতরের অদৃশ্য কিছু ‘সেটিং’ এর কথা। এসব অভিযোগ এতদিন কানাঘুষায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার সরাসরি মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক।
রোববার দুপুরে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের তদন্ত কর্মকর্তাদের একটি দল হঠাৎ বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন এলাকায় প্রবেশ করে। তাদের উপস্থিতিতে পুরো পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে যায়। ইমিগ্রেশনের ডেস্ক, ডিউটি রুম, নথিপত্র সংরক্ষণের সেকশন—সব জায়গায় শুরু হয় নীরিক্ষা। কর্মকর্তারা বিভিন্ন রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করেন, সাম্প্রতিক শিফটের লগবই থেকে শুরু করে সন্দেহজনক নথি পর্যন্ত। তদন্ত দলের সদস্যরা সরাসরি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও কর্মীদের একে একে জিজ্ঞেস করেন—কীভাবে নথি যাচাই হয়, কোন পরিস্থিতিতে ছাড়পত্র দেওয়া হয়, আর কোথায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।
দুদকের কর্মকর্তা দলটির সাথে কথা বলেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ সুপারসহ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার। কারও কারও সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনাও হয়েছে। কারণ, অভিযোগের ধরণটা সাধারণ নয়। এখানে ঘুষের বিনিময়ে ভ্রমণের অনুমতি, জাল নথি ব্যবহার করে দেশ ছাড়ার সুবিধা—এসব সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা, অভিবাসন নীতি ও আন্তর্জাতিক সুনামের সাথে জড়িয়ে।
দুদক পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, তারা বেশ কিছু নির্ভরযোগ্য অভিযোগ পেয়েছিল। সেই অভিযোগে বলা হয়েছিল, কিছু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা ও দালাল চক্র মিলেমিশে অর্থের বিনিময়ে যাত্রীদের ছাড়পত্র নিশ্চিত করছে। কেউ বৈধ কাগজ না পেলেও ‘চোখ বুজে’ পাস করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীদের কাছে আগে থেকেই সাজানো–গোছানো জাল নথি সরবরাহের অভিযোগও উঠে আসছে।
এ ধরনের কার্যক্রম যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা ইমিগ্রেশন–সম্পর্কিত যেকোনো তদন্তে খুব দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যায়। কারণ, এটিই একটি দেশের আন্তর্জাতিক প্রবেশ–বাহিরের প্রধান নিরাপত্তা স্তর। এখানে অনিয়ম মানে সরাসরি দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করা।
দুদকের তদন্ত দল এখন সংগ্রহ করা নথি আর তথ্য যাচাই–বাছাই করছে। কোন নথিতে অসঙ্গতি আছে, কার শিফটে বেশি অনিয়ম ঘটেছে, কোন যাত্রী কী প্রক্রিয়ায় ছাড়পত্র পেয়েছে—এগুলো মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি হবে। সেই প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে প্রাথমিক সত্যতা কতটা নিশ্চিত হয় তার ওপর।
দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, এই ধরনের অভিযান সাধারণত দুই ধরনের প্রভাব ফেলে। প্রথমত, যে অনিয়মগুলো এতদিন গোপনে চলছিল, তা চিহ্নিত করা সহজ হয়। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো সতর্ক হয়ে ওঠে, যা ভবিষ্যতে অনিয়ম কমাতে ভূমিকা রাখে। তদন্তকারী দলের মতে, এই যাচাই–বাছাই শুধু বর্তমান অভিযোগের খতিয়ান নয়—ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বল জায়গাগুলোও স্পষ্ট করবে।
পাশাপাশি বিমানবন্দরের যাত্রী ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা ইউনিটগুলোও নতুন করে নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে ভাববে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ, যোগাযোগব্যবস্থা থেকে পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ—সব কিছু মিলিয়ে দেশটিকে আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করে এয়ারপোর্টই। সেখানে বিশ্বাসযোগ্যতা টিকিয়ে রাখা জরুরি।
এখন চোখ রাখা হবে দুদকের পরবর্তী প্রতিবেদনের দিকে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। আর অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হলে ইমিগ্রেশন বিভাগের ওপর আস্থা আবারও দৃঢ় হবে। যে দিকেই যাক, এই অভিযান অন্তত দেখিয়ে দিল—অভিযোগ যত বড়ই হোক, তদন্তের আওতার বাইরে নেই কেউ।



