
রিয়াদ এয়ার ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : সৌদি আরব তার বিমান চলাচল খাতে আরেক দফা বড় ধরনের রূপান্তরের পথে হাঁটছে। দেশটি এবার একসাথে তিনটি নতুন বিমান সংস্থা চালুর পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে চলেছে। এই উদ্যোগ সৌদির বিদ্যমান চার বিমান সংস্থা—সৌদিয়া, ফ্লাইনাস, ফ্লাইডিয়াল এবং সদ্য যাত্রা শুরু করা রিয়াদ এয়ারের পাশাপাশি নতুন শক্তি হিসেবে যুক্ত হবে।
নতুন যুগের দিকে সৌদি বিমান খাত
রিয়াদে অনুষ্ঠিত সিটিস্কেপ গ্লোবাল রিয়েল এস্টেট সম্মেলনে সৌদি পর্যটন কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী ফাহাদ হামিদাদ্দিন কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেন, দেশের বিমান খাত এখনো তার পূর্ণ সম্ভাবনার শুরুতেই আছে। তার ভাষায়, “একটি শক্তিশালী জাতীয় বিমান সংস্থা শুধু যোগাযোগ বাড়ায় না, বরং পুরো একটি গন্তব্য তৈরি করে ফেলে। আমাদের সামনে আরও তিনটি নতুন সংস্থার ঘোষণা আসছে।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই পরিষ্কার হয়—দেশটি বিমান শিল্পকে ঘিরে একটি দীর্ঘমেয়াদি, উচ্চাভিলাষী রূপান্তর পরিকল্পনায় এগোচ্ছে, যেটা মূলত সৌদি ভিশন ২০৩০-এর অংশ।
কেন তিনটি নতুন বিমান সংস্থা?
সৌদি আরব গত দশকে নিজেকে ধর্মীয় কেন্দ্রিক দেশ থেকে একটি বিশ্বব্যাপী পর্যটন ও বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পর্যটন, লজিস্টিকস এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়াই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
এই প্রেক্ষাপটে বিমান শিল্পকে শক্তিশালী করা শুধু কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়—দেশটির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দিক-পরিকাঠামোর জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন তিনটি বিমান সংস্থার ভূমিকা সংক্ষেপে এমনভাবে দাঁড়ায়—
১. দাম্মাম-ভিত্তিক কম খরচের বিমান সংস্থা
দেশটির পূর্বাঞ্চলের প্রধান শহর দাম্মামে কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি নতুন লো-কোস্ট ক্যারিয়ার গড়ে তোলা হবে। এটি বিশেষভাবে বাজেট ভ্রমণকারীদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী—
- ২০৩০ সালের মধ্যে বহরে থাকবে ৪৫টি বিমান
- পরিচালিত হবে ২৪টি অভ্যন্তরীণ এবং ৫৭টি আন্তর্জাতিক রুট
- বছরে যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা দাঁড়াবে ১ কোটি
এটি চালু হলে শুধু সৌদির পূর্বাঞ্চলের যাত্রীই নয়, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সংযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
২. মদিনা-কেন্দ্রিক ধর্মীয় পর্যটন বিমান সংস্থা
দ্বিতীয় বিমান সংস্থাটি সরাসরি মদিনা থেকে পরিচালিত হবে। যেহেতু বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক মুসলমান মদিনা ও মক্কা ভ্রমণ করেন, তাই ধর্মীয় ভ্রমণকারীদের জন্য এটি হবে বিশেষায়িত এয়ারলাইন।
এখন পর্যন্ত অধিকাংশ তীর্থযাত্রী জেদ্দা হয়ে মদিনায় যান। যদিও দুই শহরের মধ্যে উচ্চগতির ট্রেন রয়েছে, তবে সরাসরি মদিনাগামী আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এখনো সীমিত। নতুন সংস্থা এটি বদলে দেবে।
বিশেষ করে ওমরাহ ও হজ মৌসুমে এই এয়ারলাইনের গুরুত্ব হবে ব্যাপক।
৩. তৃতীয় বিমান সংস্থার তথ্য এখনো গোপন
তৃতীয় বিমান সংস্থার ধরন, উদ্দেশ্য, পরিচালনা কাঠামো — এসবই এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এটি হয়তো রিয়াদ এয়ারকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক প্রিমিয়াম রুট নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে, অথবা দেশের আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানোর জন্য একটি বিশেষায়িত ক্যারিয়ার হতে পারে।
ব্র্যান্ড নাম, লঞ্চ সময়সূচি বা কোন ধরনের বিমান ব্যবহার করা হবে—এসবই এখনো গোপন রাখা হয়েছে।
পর্যটন বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব
২০১৯ সাল পর্যন্ত সৌদি আরব আন্তর্জাতিক পর্যটনের জন্য প্রায় বন্ধ ছিল। ব্যবসায়িক ভ্রমণকারী আর তীর্থযাত্রীরাই মূলত দেশটিতে প্রবেশ করতে পারতেন। কিন্তু ২০১৯ সালে পর্যটন ভিসা চালু করার পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়।
এই পরিবর্তনের পর দেশটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পর্যটন খাত বিস্তারে কাজ শুরু করে। তুলনা করলে দেখা যায়—
- ২০১৯ সালে প্রথমবার পর্যটন উন্মুক্ত হয়
- বর্তমানে লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ কোটি দর্শনার্থী
- এর মধ্যে ৫ কোটি আন্তর্জাতিক পর্যটক
এখন যে হারে নতুন প্রকল্প ঘোষণা হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে এই লক্ষ্য অর্জনে সৌদি আরব আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
বিমান খাতে বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
AGBI-এর তথ্য মতে, ২০২৪ সালে সৌদি আরবের বিমান চলাচল খাতে যাত্রী পরিবহন সংখ্যা ছিল ১২৮ মিলিয়ন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি।
এদিকে দেশটি বিমান পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিকীকরণে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে—নতুন টার্মিনাল, নতুন বিমান সংস্থা, উন্নত কার্গো সুবিধা, সবকিছু মিলিয়ে এটি এক ধরনের সম্পূর্ণ শিল্প পরিবর্তন।
হামিদাদ্দিন তার বক্তব্যে বলেন, “সহজভাবে বললে, এই মুহূর্তে সৌদি আরবই বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিমান শিল্প রূপান্তর ঘটাচ্ছে।”
- সৌদি আরব শুধু আকাশপথ শক্তিশালী করছে না; তারা বৈশ্বিক পর্যটন ও ট্রাভেল মার্কেটে নিজেদের নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
- তিনটি নতুন বিমান সংস্থা দেশটিকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
- এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়বে, পর্যটন খাত আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের অর্থনীতি তেলের ওপর নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন দিগন্ত পাবে।



