২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্য হাই কমিশনের জরুরি সতর্কতা: ভিসা ও সরকারি সেবা নিয়ে বাড়ছে প্রতারণা, সতর্ক থাকার আহ্বান

যুক্তরাজ্য হাই কমিশনের জরুরি সতর্কতা

ছবিটি এআই জেনারেটেড

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাজ্য হাই কমিশন আবারও জনসাধারণকে প্রতারণা ও ছদ্মবেশী জালিয়াতি সম্পর্কে সতর্ক করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভিসা, কর্মসংস্থান এবং সরকারি সেবার নামে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে নানা ধরণের প্রতারণার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় হাই কমিশন তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একটি বিস্তারিত জনসতর্কতা প্রকাশ করেছে। এতে যুক্তরাজ্য সরকারের অফিসিয়াল “Fraud, Scams and Tricks” নির্দেশিকাও শেয়ার করা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা চিহ্নিত করার উপায় এবং নিরাপদ থাকার সুনির্দিষ্ট পরামর্শ রয়েছে।

হাই কমিশনের বক্তব্য পরিষ্কার—প্রতারকরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে ভ্রমণ, পড়াশোনা বা চাকরির আশায় থাকা বাংলাদেশিরা এই প্রতারণার সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ছেন।

প্রতারণার চারটি প্রধান সংকেত যেগুলো চেনা জরুরি

হাই কমিশন তাদের সতর্কবার্তায় চার ধরনের ঝুঁকি আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। এগুলো বোঝা গেলে বেশিরভাগ প্রতারণাই আগেভাগে চিনে ফেলা সম্ভব।

১. স্বরাষ্ট্র দপ্তর বা ভিসা অফিস পরিচয় দিয়ে হঠাৎ যোগাযোগ

অনেকেই ফোন, ইমেল বা মেসেজ পান যেখানে কথিত কর্মকর্তারা বলেন—আপনার ভিসা আবেদন আটকে আছে, দ্রুত টাকা পাঠাতে হবে, নইলে আবেদন বাতিল হবে।
হাই কমিশনের মতে, এ ধরনের যোগাযোগের সম্ভাবনা ঘনঘন হলেও সেগুলো প্রায় সবই ভুয়া।
যুক্তরাজ্যের সরকারি সংস্থাগুলো কখনও অপ্রত্যাশিত ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে ভিসা নিয়ে চাপ সৃষ্টি করে না।

২. সত্য হওয়ার মতোই অসম্ভব প্রতিশ্রুতি

প্রতারকরা প্রায়ই প্রলোভন দেখায়—গ্যারান্টিযুক্ত ভিসা, দ্রুত চাকরি, বিশেষ সুযোগ, অল্প টাকায় নিশ্চিত ওয়ার্ক পারমিট।
বাস্তবতা হলো, যুক্তরাজ্যের কোনও ভিসাই “নিশ্চিত” নয়, কোনও মধ্যস্থতাকারীর হাত ধরে নয়, আর কোনও গোপন ত্বরিত প্রক্রিয়াও নেই।
এই ধরনের অফার দেখলেই সতর্ক হওয়া উচিত।

৩. সন্দেহজনক বা অনিরাপদ পদ্ধতিতে টাকা চাওয়া

অনেক ক্ষেত্রে প্রতারকরা ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে বলে, আবার কখনও ভাউচার বা ডিজিটাল কার্ডে অর্থ চায়।
হাই কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে—যুক্তরাজ্যের আসল ভিসা পরিষেবাগুলো কখনও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে বা অনিরাপদ মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করে না।
যেখানে সরকারি ফি পরিশোধ করতে হয়, সেটা শুধুমাত্র সরকারি অনলাইন পোর্টালই গ্রহণ করে।

৪. নকল ইমেল ঠিকানা ও ওয়েবসাইট

স্ক্যামাররা এমন ইমেল বা ওয়েবসাইট তৈরি করে যা দেখে প্রথমে সরকারি মনে হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, “gov.uk”–এর মতো দেখতে অন্য ডোমেইন, বা এমন ইমেল যা সরকারি পরিচয় নকল করে।
হাই কমিশনের স্মরণ করিয়ে দেওয়া—অরিজিনাল যুক্তরাজ্য সরকারি ডোমেইন কেবল “.gov.uk” দিয়ে শেষ হয়, এবং হোম অফিসের ইমেল সাধারণত name.surname@homeoffice.gov.uk বা @fcdo.gov.uk থেকে আসে।

কিভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখা সম্ভব

হাই কমিশন শুধু সতর্কতাই দেয়নি, কীভাবে নিজের তথ্য ও টাকা সুরক্ষিত রাখা যায়, সে বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা জানিয়েছে।

১. ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করবেন না
কেউ যদি তাড়াহুড়ো করে আপনার পাসপোর্ট, জন্মসনদ, ব্যাংক তথ্য, বা অন্যান্য গোপন নথি চায়—তাৎক্ষণিকভাবে না করে ভেবে দেখুন। সন্দেহ হলে যোগাযোগ বন্ধ করুন।

২. স্বাধীনভাবে যাচাই করুন
যে-ই যোগাযোগ করুক, তার পরিচয় যাচাই করুন। নিজে GOV.UK সাইটে গিয়ে যোগাযোগের তথ্য খুঁজে নিয়ে সেখান থেকে নিশ্চিত হন। ফেসবুক বা মেসেঞ্জারের বার্তায় ভরসা করা ঠিক নয়।

৩. সন্দেহজনক কিছু দেখলেই রিপোর্ট করুন
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতারণার ক্ষেত্রে অ্যাকশন ফ্রডের কাছে অভিযোগ করা যায়। আবার ফিশিং ইমেল বা সন্দেহজনক ওয়েবসাইট জাতীয় সাইবার সিকিউরিটি সেন্টারে পাঠানো যায়।

বাংলাদেশি নাগরিকরা কেন বিশেষভাবে ঝুঁকিতে

হাই কমিশন বলছে, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসন বা চাকরি পাওয়ার আগ্রহ বেশি, আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগায় প্রতারকেরা।
গত কয়েক বছরে “ওয়ার্ক ভিসা” জালিয়াতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এ ধরনের প্রতারণায় সাধারণত আকর্ষণীয় চাকরির প্রতিশ্রুতি দেখানো হয়, তার সঙ্গে থাকে অগ্রিম “প্রসেসিং ফি” দেওয়ার শর্ত।
এই টাকা নেওয়ার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়, আর ভুক্তভোগীরা বুঝতে পারেন তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে, যুক্তরাজ্যে কাজের ভিসা আবেদনে কোনো এজেন্ট বা দালাল গ্যারান্টি দিতে পারে না। সমস্ত আবেদন করা হয় সরাসরি সরকারি সিস্টেমের মাধ্যমে, এবং যেকোনো ধরণের ফি কেবল সরকারি পোর্টালেই পরিশোধ করা যায়।

ঢাকায় যুক্তরাজ্য হাই কমিশনের মূল বার্তা সরল—সতর্ক থাকুন, যাচাই করুন, আর প্রতারণা দেখলেই রিপোর্ট করুন।
স্ক্যামারদের কৌশল যতই উন্নত হোক, মানুষ সচেতন থাকলে প্রতারণা রোধ করা সম্ভব।
বিশেষ করে যারা যুক্তরাজ্যে ভ্রমণ, পড়াশোনা বা কাজের পরিকল্পনা করছেন, তাদের প্রতিটি ধাপেই তথ্য যাচাই করা উচিত।
একটু সতর্কতা অনেক বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে, আর সঠিক তথ্য জানা থাকলে জালিয়াতির ফাঁদ এড়ানো কঠিন নয়।


Read Previous

শ্রীপুরের চা বাগান—গাজীপুরের সবুজ ঢেউয়ে হারিয়ে যাওয়ার এক অনন্য ভ্রমণ অভিজ্ঞতা

Read Next

সৌদি আরব তিনটি নতুন বিমান সংস্থা চালুর পথে — মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular