
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বিশ্ব পর্যটন খাতে নতুন ইতিহাস রচিত হলো। জাতিসংঘ পর্যটনের (UN Tourism) ৫০ বছরের যাত্রায় প্রথমবারের মতো একজন নারী মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন — সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাইখা আল নোয়াইস। রিয়াদে অনুষ্ঠিত সংস্থার ২৬তম সাধারণ পরিষদে তার মনোনয়ন সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয়। আগামী ২০২৬ সালের শুরুতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়
শাইখা আল নোয়াইস শুধু প্রথম নারী হিসেবেই নয়, একজন অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা ও কৌশলবিদ হিসেবেও বিশ্ব পর্যটন অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। রোটানা হোটেলসের কর্পোরেট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করে তিনি আতিথেয়তা শিল্পে নেতৃত্বের নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছেন। পাশাপাশি তিনি আবুধাবি চেম্বারের ট্যুরিজম ওয়ার্কিং গ্রুপের সভাপতি, আবুধাবি বিজনেসওমেন কাউন্সিল এবং লেস রোচেস হসপিটালিটি একাডেমির বোর্ড সদস্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
পরিষদের অধিবেশনে তার বক্তব্য ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরা। তিনি বলেন, “এটি শুধু আমার নয়, আমাদের সবার বিজয়। পর্যটন হলো আশা, সংযোগ ও মানবতার এক সেতুবন্ধন।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা এমন এক বিশ্ব গড়তে চাই, যেখানে পর্যটন হবে দায়িত্বশীল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সর্বাধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাঁচ দিকনির্দেশনা
নতুন মহাসচিব তার মেয়াদে পাঁচটি মূল অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছেন:
১. দায়িত্বশীল পর্যটন – পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি, টেকসই ভ্রমণ নীতির প্রচার।
২. ক্ষমতা বৃদ্ধি – সদস্য দেশগুলোর পর্যটন খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ জোরদার করা।
৩. ভালো কাজের জন্য প্রযুক্তি – কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স ও স্মার্ট ট্যুরিজম টুলস ব্যবহারের মাধ্যমে সেবার মান উন্নয়ন।
৪. উদ্ভাবনী অর্থায়ন – ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, নারী ও যুবকদের পর্যটন ব্যবসায় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে বিশেষ তহবিল গঠন।
৫. স্মার্ট শাসনব্যবস্থা – নীতি ও প্রশাসনে স্বচ্ছতা, অংশীদারিত্ব এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর।
তার মতে, এই পাঁচটি দিকনির্দেশনা শুধু পর্যটন খাত নয়, বিশ্ব অর্থনীতিকেও নতুন গতি দেবে।
আগের নেতৃত্বকে শ্রদ্ধা
দায়িত্ব গ্রহণের আগেই শাইখা আল নোয়াইস বর্তমান মহাসচিব জুরাব পোলোলিকাশভিলির কাজের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, “তার দূরদর্শী নেতৃত্ব জাতিসংঘ পর্যটনকে বৈশ্বিক পর্যায়ে দৃঢ় অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।”
সাধারণ পরিষদের গুরুত্ব
রিয়াদের ২৬তম সাধারণ পরিষদ ছিল সংস্থার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন। এখানে ১৬০টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। নতুন মহাসচিব নির্বাচনের পাশাপাশি বৈশ্বিক পর্যটন পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন এবং শিক্ষা সম্প্রসারণ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
অধিবেশন শুরু হয় জাতিসংঘ পর্যটনের ১২৪তম নির্বাহী পরিষদের সমাপ্তি ঘোষণার পর, যেখানে ভবিষ্যতের জন্য একটি যৌথ কর্মসূচি উপস্থাপন করা হয় — বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উদ্ভাবনকে সহায়তা এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটন খাতকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানানো হয়।
একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
জাতিসংঘ পর্যটনের নেতৃত্বে নারী প্রতিনিধিত্বের এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন কেবল প্রতীকী নয়। এটি এমন এক বার্তা দেয় যে বিশ্ব পর্যটন এখন আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈচিত্র্যময় এবং মানবিক ভবিষ্যতের পথে এগোচ্ছে। শাইখা আল নোয়াইসের নেতৃত্বে সংস্থাটি আগামী বছরগুলোতে নতুন গন্তব্য, টেকসই নীতি ও উদ্ভাবনী প্রকল্পের মাধ্যমে পর্যটনকে বৈশ্বিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম চালিকা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
এখন বিশ্বের নজর সেই নারী নেতার দিকে, যিনি পর্যটনের মাধ্যমে মানুষের সংযোগ, সংস্কৃতির বিনিময় এবং অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের নতুন গল্প লিখতে যাচ্ছেন।



