
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিমান ভ্রমণ আরও কঠিন হয়ে উঠছে। ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)-এর নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৪ নভেম্বরের মধ্যে বাধ্যতামূলক ফ্লাইট বাতিলের হার ১০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি অচলাবস্থার (শাটডাউন) কারণে এফএএ কর্মী সংকটে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বিমানবন্দরগুলোতে।
শুক্রবার ৪০টি প্রধান বিমানবন্দরে ফ্লাইট কার্যক্রম হ্রাসের পর থেকে রবিবার পর্যন্ত ৭,২০০টিরও বেশি ফ্লাইট বিলম্বিত এবং ২,২০০টি ফ্লাইট সম্পূর্ণ বাতিল হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এটি আসলে একটি “চাপ কমানোর প্রচেষ্টা”, কারণ সরকারি অচলাবস্থা রেকর্ড দীর্ঘ সময় ধরে চলায় বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটেছে।
ধাপে ধাপে ফ্লাইট বাতিল বৃদ্ধি
এফএএ জানিয়েছে, বাধ্যতামূলক এই হ্রাস ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। প্রথমে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত ফ্লাইট কার্যক্রম ৪ শতাংশ কমানো হচ্ছে। ১১ নভেম্বরের মধ্যে এটি ৬ শতাংশ, ১৩ নভেম্বরের মধ্যে ৮ শতাংশ, এবং ১৪ নভেম্বরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। এর অর্থ, নভেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হতে পারে।
সরকারি অচলাবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে
পরিবহন সচিব শন ডাফি জানিয়েছেন, যত দ্রুতই সরকারি শাটডাউন শেষ হোক না কেন, বিমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে স্বাভাবিক হবে না। কারণ অনেক কর্মী ছুটিতে আছেন, এবং তাদের কাজে ফিরতে ও সম্পূর্ণ কার্যক্রম পুনরুদ্ধারে সময় লাগবে।
রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ডাফি বলেন, “থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের আগে যাত্রীদের ভ্রমণ একটু কমিয়ে আনা হবে। অনেকেই হয়তো এবার পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটাতে পারবেন না।”
তার এই সতর্কবার্তা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ছুটির মৌসুমের আগে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহেই থ্যাঙ্কসগিভিং, যখন লাখো মানুষ ভ্রমণে বের হয়।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে নিউ ইয়র্ক সিটি এলাকার যাত্রীরা
এফএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে দীর্ঘ বিলম্ব হচ্ছে নিউ ইয়র্ক সিটি অঞ্চলের বিমানবন্দরগুলোতে। কুইন্সের লাগার্ডিয়া বিমানবন্দরে একটি ফ্লাইট ছাড়তে গড়ে ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় লাগছে। লাগার্ডিয়া কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সীমিত কর্মী উপস্থিতির কারণে ফ্লাইট শিডিউল মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
বিমানবন্দর প্রশাসন যাত্রীদের আগেই সতর্ক করেছে—“বিমানবন্দরে পৌঁছানো, চেক-ইন ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার জন্য অতিরিক্ত সময় হাতে রাখুন।”
অন্যদিকে, নিউ জার্সির নিউয়ার্ক লিবার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও পরিস্থিতি ভালো নয়। সেখানে ফ্লাইট ছাড়ার গড় বিলম্ব ২ ঘণ্টা ১৪ মিনিট, তবে কিছু ক্ষেত্রে তা ৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট পর্যন্তও গড়িয়েছে।
এছাড়া, নিউ ইয়র্ক সিটির মাত্র ১২ মাইল দূরে অবস্থিত টেটারবোরো বিমানবন্দরে গড় বিলম্ব ৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিটেরও বেশি। এই বিমানবন্দর মূলত ব্যবসায়িক জেট বা প্রাইভেট ফ্লাইটের জন্য পরিচিত, কিন্তু সাম্প্রতিক বিলম্ব সেখানে-ও মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে।
ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টি বিমানবন্দর থেকেও গড়ে দেড় ঘণ্টার বেশি বিলম্বে ফ্লাইট ছাড়ছে। যদিও এফএএ বলছে, এই বিলম্ব যাত্রী সংখ্যার ওঠানামার ওপর নির্ভর করে।
জন এফ. কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (জেএফকে) পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো, তবে সেখানেও গড়ে এক ঘণ্টার বেশি দেরি হচ্ছে।
অর্থনীতি ও যাত্রী অভিজ্ঞতায় নেতিবাচক প্রভাব
এই বিলম্ব ও বাতিলের ধারা বিমান সংস্থা এবং যাত্রী—দু’পক্ষের জন্যই বড় ধাক্কা। বিমান সংস্থাগুলোর জন্য এটি অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল, কারণ প্রতিটি বাতিল ফ্লাইট মানে ক্ষতিগ্রস্ত ক্রু শিডিউল, পুনর্বুকিং খরচ, এবং যাত্রী ক্ষতিপূরণের দাবি। অন্যদিকে, যাত্রীরা দীর্ঘ অপেক্ষা, সংযোগ ফ্লাইট মিস, এমনকি ছুটি বাতিলের মতো পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন।
এভিয়েশন বিশ্লেষকদের মতে, যদি সরকারি শাটডাউন দ্রুত শেষ না হয়, তবে থ্যাঙ্কসগিভিং ও বড়দিন মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সামনে কী হতে পারে
এফএএ বলছে, তারা “প্রয়োজনীয় সীমার মধ্যে” ফ্লাইট হ্রাসের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যাতে নিরাপত্তা বজায় রেখে কিছুটা সুষ্ঠুতা আনা যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এভাবে কর্মীসংকটে বিমান নিয়ন্ত্রণ চালানো টেকসই নয়।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথে এই মুহূর্তে যে চাপ ও অনিশ্চয়তা চলছে, তা শুধু একটি প্রশাসনিক অচলাবস্থার নয়—এটি একটি সতর্কবার্তা যে বিমান ব্যবস্থার প্রতিটি স্তর কতটা নাজুক হয়ে পড়েছে।
যাত্রীদের জন্য এখন সবচেয়ে ভালো পরামর্শ—ভ্রমণ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করুন, বিকল্প তারিখ ও সময় রাখুন, এবং বিমানবন্দরে আগেই পৌঁছান। কারণ নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের আকাশপথে ঝড় থামার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না।



