
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ফিলিপিন্স আবারও ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত। দেশটির উত্তরাঞ্চলে আঘাত হেনেছে সুপার টাইফুন ফাং-ওং (স্থানীয়ভাবে পরিচিত উয়ান)। প্রবল বেগে বইতে থাকা বাতাস ও টানা বৃষ্টিতে অরোরা, ইসাবেলা ও বিকলসহ একাধিক অঞ্চল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে দুইজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং আহত হয়েছে বহু মানুষ। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিপুল এলাকা, স্থবির হয়ে গেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
রোববার (৯ নভেম্বর) রাত ৯টা ১০ মিনিটে ফিলিপিন্সের উত্তরাঞ্চলীয় লুজন দ্বীপের অরোরা প্রদেশে আঘাত হানে ফাং-ওং। ফিলিপিন্সের আবহাওয়া অধিদপ্তর পাগাসা জানিয়েছে, ঘণ্টায় প্রায় ১৮৫ কিলোমিটার বেগে আছড়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড়টি। মুহূর্তের মধ্যেই উপকূলীয় অঞ্চলে গাছপালা উপড়ে পড়ে, ঘরবাড়ি ভেঙে যায়, এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও উদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে সেনা ও জরুরি সেবা সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা
অরোরা, ইসাবেলা ও বিকল অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ঝড়ের দমকা হাওয়ায় বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে, গাছের ডাল ছিঁড়ে পড়েছে তারের ওপর। দেশের কেন্দ্রীয় ও পূর্বাঞ্চলেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। হাজারো পরিবার এখন আশ্রয়হীন অবস্থায় সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে।
দুর্যোগ মোকাবিলা সংস্থা জানিয়েছে, ঝড়ের আগেই দশ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। ফলে প্রাণহানির সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ। অনেক এলাকা এখনো পানির নিচে ডুবে আছে, রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
পরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে দেশের শত শত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে বেশ কয়েকটি বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। সমুদ্রপথেও সব ধরনের যাত্রী ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। উপকূলের মাছ ধরার নৌকাগুলো আগেই স্থলভাগে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
পুনরায় দুর্যোগের মুখে ফিলিপিন্স
মাত্র এক সপ্তাহ আগেই ফিলিপিন্সে আঘাত হেনেছিল আরেকটি শক্তিশালী ঝড় টাইফুন কালমেইগি, যেখানে দুই শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান এবং লাখো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি, এমন সময় আবারও আঘাত হানল ফাং-ওং। ধারাবাহিক এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ ফিলিপিন্সের দুর্বল অবকাঠামো ও অর্থনীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।
ঝড়ের অগ্রগতি ও পরবর্তী আশঙ্কা
পাগাসার সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফাং-ওং সোমবার সকাল থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে তাইওয়ান প্রণালির দিকে যাবে। এরপর বৃহস্পতিবার নাগাদ পশ্চিম তাইওয়ানে পৌঁছে দুর্বল হয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ভূমিধসের আশঙ্কা থাকায় স্থানীয় প্রশাসন সতর্কতা জারি রেখেছে।
সরকারের আহ্বান ও সহায়তা কার্যক্রম
প্রেসিডেন্ট মার্কোস জুনিয়র নাগরিকদের ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে। কেউ যেন আতঙ্কিত না হয়, বরং কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলুন।” সেনাবাহিনী ও পুলিশ উদ্ধার অভিযানে যোগ দিয়েছে, বিশেষ করে অরোরা ও ইসাবেলা অঞ্চলে আটকে পড়া মানুষদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
বাস্তব চিত্র
স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় ঘরবাড়ি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল ও সরকারি ভবনগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে রাস্তাঘাট, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। ত্রাণ বিতরণ শুরু হলেও অনেক দুর্গম এলাকায় এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
প্রায়ই ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে বিপর্যস্ত হয় ফিলিপিন্স, কিন্তু ফাং-ওং যেন তার ভয়াবহতার নতুন রেকর্ড গড়েছে। এখনো ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টি চলছে, এবং আশঙ্কা রয়েছে—ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দেশের উত্তরাঞ্চলে উদ্ধারকর্মীদের রাতদিনের পরিশ্রম চললেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।
এই মুহূর্তে ফিলিপিন্সের মানুষের একটাই প্রার্থনা—ফাং-ওং যেন দ্রুত দুর্বল হয়ে যায় এবং আর কোনো প্রাণহানি না ঘটে।



