১৮/০৪/২০২৬
৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রূপ হারাচ্ছে কুয়াকাটা সৈকত: সাগরকন্যার ভবিষ্যৎ কি অন্ধকারে?

কুয়াকাটা প্রতিনিধি।  পর্যটন সংবাদ : বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষা কুয়াকাটা — যে সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায় একই জায়গা থেকে — সেই অনন্য সৌন্দর্য আজ ম্লান হয়ে যাচ্ছে দূষণ, ভাঙন আর অব্যবস্থাপনায়। একসময় যাকে সবাই ডাকত “সাগরকন্যা”, এখন সেখানে ভর করেছে হতাশা।

সৈকতের বর্তমান চিত্র

সাম্প্রতিক সফরে দেখা গেছে, সৈকতের জিরো পয়েন্টে পড়ে আছে ভাঙা ঝাউগাছ, চারদিকে ছড়িয়ে আছে প্লাস্টিক আর বোতলের আবর্জনা। বালুক্ষয় ঠেকাতে বসানো জিও ব্যাগগুলোর ফাঁকফোকরে জন্ম নিয়েছে শ্যাওলা। এগুলো এখন এতটাই পিচ্ছিল যে, পর্যটকরা হাঁটতেই ভয় পান।

সৈকতের মূল অংশে সারি-সারি অস্থায়ী দোকান, যেখানে একসময় ছিল খোলা বালুকাবেলা। পাশেই পড়ে আছে ভাঙা কংক্রিটের টুকরো, যেগুলো ঢেউয়ের সঙ্গে এসে সৈকতে জমছে। আর জিও ব্যাগের সারিতে বালু ফেটে বেরিয়ে আসছে জায়গায় জায়গায়। ফলে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে তার আগের জৌলুস।

পর্যটকদের অভিজ্ঞতা

ফরিদপুর থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক রাহুল দেব বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম কুয়াকাটা কক্সবাজারের মতো সুন্দর হবে। কিন্তু এখানে এসে দেখি সৈকতের অবস্থা করুণ। হাঁটতেই ভয় লাগে। কোথাও বসার জায়গা নেই, জিও ব্যাগে পা পিছলে যাওয়ার ভয়।”

তার স্ত্রী মীনা দেবীর মন্তব্য, “এখানে কোনো সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। সৈকতটা দেখতে এখন নোংরা আর অগোছালো লাগে। দ্বিতীয়বার আসার ইচ্ছে নেই।”

সৈকতের স্থানীয় দোকানি আব্দুল করিম বলেন, “আগে পর্যটক ভিড় ছিল অনেক, এখন কমে গেছে। সৈকত প্রতিদিন ভাঙছে, ঝাউগাছ পড়ে যাচ্ছে। অথচ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কেউ তেমন পদক্ষেপ নিচ্ছে না।”

ইতিহাস ও নামের উৎস

প্রায় আঠারো শতকের শেষ দিকে রাখাইন জাতিগোষ্ঠী যখন আরাকান থেকে পালিয়ে এ তীরে এসে বসতি গড়ে, তখনই জন্ম নেয় ‘কুয়াকাটা’। রাখাইনরা নোনা পানি ব্যবহার করতে না পেরে বালুর নিচে কুয়া খনন করে সুপেয় পানি তুলতেন। সেই “কুয়া” থেকেই জায়গাটির নাম হয় “কুয়াকাটা”।

আজও রাখাইন সংস্কৃতি, প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির আর ঐতিহ্যবাহী ঘরবাড়ি পর্যটকদের টানে। রাস পূর্ণিমা ও মাঘী পূর্ণিমায় হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এখানে সমুদ্রস্নান ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন।

ভাঙন ও দূষণের দীর্ঘ ইতিহাস

স্থানীয় পরিবেশ কর্মী মং সো মিন জানান, “আমরা ছোটবেলায় যেখানে খেলতাম, এখন সেই জায়গা সাগরের নিচে। অন্তত তিন কিলোমিটার সৈকত হারিয়ে গেছে গত কয়েক দশকে।”

বিজ্ঞান সাময়িকী ফ্রন্টিয়ার্স ইন মেরিন সায়েন্স-এর এক গবেষণায় বলা হয়, ১৯৮৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে কুয়াকাটার উপকূলরেখা প্রতি বছর প্রায় শূন্য দশমিক ৩২ বর্গকিলোমিটার করে পিছিয়ে গেছে। মোট হারিয়েছে ১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি ভূমি।

২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকে ভাঙনের গতি আরও বেড়েছে। ইতিমধ্যে উপকূল রক্ষার প্রায় ৪০০ একর ঝাউবন সাগরে তলিয়ে গেছে।

জিও ব্যাগ বিতর্ক

বালুক্ষয় ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সৈকতে জিও ব্যাগ বসাচ্ছে বহু বছর ধরেই। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি কেবল অস্থায়ী সমাধান নয়, বরং দুর্নীতির পথও খুলে দিয়েছে।

পরিবেশ সংগঠক রাশেদ মাহবুব বলেন, “প্রতিবছর বর্ষার সময় জিও ব্যাগ ফেলার নাম করে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, কিন্তু কাজের কোনো ফল পাওয়া যায় না। ছেঁড়া ব্যাগ, পচা বালু, আর প্লাস্টিক— এসবই এখন সৈকতের চেহারা বদলে দিয়েছে।”

তার মতে, “এভাবে সৈকত রক্ষা হবে না। বরং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে টেকসই ব্লক বসানো দরকার, যাতে সৌন্দর্যও বজায় থাকে, ক্ষয়রোধও হয়।”

সরকারি পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি

পর্যটন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, “আমাদের কাছে কুয়াকাটাকে ঘিরে একটি মহাপরিকল্পনা আছে। লক্ষ্য হচ্ছে টেকসই ও ইকো-ট্যুরিজম ভিত্তিক উন্নয়ন করা। শুধু পর্যটন নয়, পরিবেশকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।”

পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান বলেন, “সৈকতের অব্যবস্থাপনা আমরা দেখেছি। পর্যটকদের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আর প্রাকৃতিক ভারসাম্য— এই তিন দিক একসাথে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা কোনো কংক্রিটের স্থাপনা গড়তে চাই না, যা সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করবে। বরং ‘প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা’— এমন উন্নয়নই হবে লক্ষ্য।”

উপসংহার

কুয়াকাটা একসময় ছিল শান্ত, নিসর্গে ভরা সৈকত— যেখানে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের দৃশ্য মানুষকে মুগ্ধ করত। আজ সেখানে আবর্জনা, শ্যাওলা আর বালুক্ষয়ের চিহ্ন। প্রশ্ন একটাই— “সাগরকন্যা” কি আবার তার পুরোনো রূপ ফিরে পাবে?

এটার উত্তর নির্ভর করছে প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ আর সচেতন নাগরিকদের যৌথ উদ্যোগের ওপর। যদি এখনই ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, হয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল গল্পেই শুনবে কুয়াকাটার নাম।

Read Previous

বিশ্বের সেরা পর্যটন গ্রামের মর্যাদা পেল স্লোভেনিয়ার ব্লেড

Read Next

এশিয়া সফরে মালয়েশিয়ায় ট্রাম্প, থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া শান্তিচুক্তি সই আজই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular