
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: শীতের আমেজ এখনও পুরোপুরি নামেনি, এরই মধ্যে সিরাজগঞ্জের চলনবিল রঙিন হয়ে উঠেছে অতিথি পাখির আগমনে। প্রতিবছরের মতো এবারও সুদূর সাইবেরিয়া ও অন্যান্য শীতপ্রবণ দেশ থেকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি এসে ভিড় জমিয়েছে বিলাঞ্চলে। উষ্ণ আবহাওয়া আর খাদ্যের প্রাচুর্যে ভরপুর এই অঞ্চল এখন তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
পাখিদের কলতান, ডানার ঝাপটায় জলছবি আর নীল আকাশের নিচে বিলজুড়ে তাদের অবাধ উড়াউড়ি—সব মিলিয়ে চলনবিল এখন এক স্বপ্নীল দৃশ্যপটে পরিণত হয়েছে। এই মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসছেন সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার চলনবিলে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চলনবিলের মধ্য দিয়ে একসময় প্রবাহিত হতো প্রায় ১৪টি নদী ও ২২টি ছোট-বড় বিল। অনেকগুলোর অস্তিত্ব এখন মুছে গেলেও, যমুনার চর ও অবশিষ্ট বিলাঞ্চলেই আশ্রয় নিচ্ছে পাখিরা। এদের মধ্যে রয়েছে—বক, ইটালি, শার্লি, পিয়াজ খেকো, ত্রিশুল, বাটুইলা, নারুলিয়া, লালস্বর, কাঁদোখোচা, ফেফি, ডাহুক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, শামকৈল ও রাতচোরা সহ নানা প্রজাতির পাখি।
এই অতিথিরা সাধারণত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অবস্থান করে। সারাদিন খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত থাকে তারা। পাখিদের আনাগোনায় যেমন বিলজুড়ে প্রাণের সঞ্চার হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে দর্শনার্থীর ভিড়ও।
তবে এই সৌন্দর্যের উৎসবের মাঝেও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ শিকার। স্থানীয়রা জানান, কিছু অসাধু শিকারি জাল ও খাঁচা ব্যবহার করে নিয়মিত পাখি ধরে বিক্রি করছে। হাটবাজারে একেকটি বক বিক্রি হচ্ছে ৯০–১০০ টাকায়, রাতচোরা জোড়া ২৫০–৪৫০ টাকায়, আর বালিহাঁস ৩২০–৬৭০ টাকায়। এই অনিয়ন্ত্রিত শিকার শুধু পাখির প্রাণহানি ঘটাচ্ছে না, পরিবেশের ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
বেসরকারি সংগঠন ‘স্বাধীন জীবন’-এর নির্বাহী পরিচালক আবদুর রাজ্জাক নাসিম বলেন, “পাখিরা প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায়, একই সঙ্গে পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আইনের প্রয়োগ না থাকায় জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।”
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শর্মিষ্ঠা সেন গুপ্ত বলেন, “অতিথি পাখিরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং ফসলের ক্ষতিকর পোকা খেয়ে কীটনাশকের প্রয়োজন কমায়। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচও কমে এবং পাখির বিষ্ঠা প্রাকৃতিক সার হিসেবে কাজে লাগে।”
প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এই সময়টাই চলনবিল ভ্রমণের সেরা সময়। তবে শর্ত একটাই—এই অতিথিদের যেন কেউ বিরক্ত না করে। কারণ, পাখিরা চলে গেলে নিস্তব্ধ হয়ে যাবে সেই বিল, যেখানে আজ জীবন গানে ভরে আছে প্রকৃতি।



