
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের অনন্য জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় সরকার গ্রহণ করতে যাচ্ছে একাধিক কার্যকর পদক্ষেপ। দ্বীপের বাস্তুতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে এবার পর্যটকদের ওপর ধার্য করা হবে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি (Environmental Conservation Fee)। পাশাপাশি, দ্বীপে বসবাসকারী মানুষদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে তাদের জীবিকা নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১২ জুলাই) পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সভায় এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
স্থানীয়দের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা
রিজওয়ানা হাসান জানান, সেন্ট মার্টিনে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর জন্য তিন বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যা আগস্ট ২০২৫ থেকে কার্যক্রম শুরু করবে। প্রথম ধাপে নির্বাচিত ৫০০ পরিবারকে হাঁস-মুরগি পালন, চিপস তৈরি, কৃষিকাজসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এরই মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে দ্বীপে দুইজন কৃষি কর্মকর্তা নিয়োগের সিদ্ধান্তও হয়েছে।
আসছে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি
সেন্ট মার্টিনে আগত পর্যটকদের কাছ থেকে পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায় করা হবে, যা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সংগ্রহ করবে। ফি’র নির্ধারিত অঙ্ক এখনো চূড়ান্ত না হলেও, এ অর্থ দ্বীপের পরিবেশ ও প্রতিবেশ সংরক্ষণে ব্যবহৃত হবে।
প্লাস্টিকমুক্ত দ্বীপের পথে
অক্টোবর ২০২৫ থেকে সেন্ট মার্টিনে একবার ব্যবহারযোগ্য (সিঙ্গেল-ইউজ) প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে প্লাস্টিকের পরিবেশবান্ধব বিকল্প উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।
সাত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক এ কে এম রফিকুল ইসলাম জানান, সাত কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হতে যাওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে দ্বীপের ১০ হাজার বাসিন্দা উপকৃত হবেন। এতে থাকবে:
- পরিবেশ প্রহরী নিয়োগ
- জলবায়ু-সহিষ্ণু ধান চাষ
- কৃষি সহায়তা
- সুপেয় পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন
- সৈকতে সাগরলতা ও কেয়া বন সৃজন
সেন্ট মার্টিনকে ৪টি জোনে ভাগ
সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিস (CEGIS) সেন্ট মার্টিনকে চারটি জোনে ভাগ করে একটি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তুলে ধরে:
- জোন-১: মাল্টিপল ইউজ জোন (পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর অনুমতি থাকবে)
- জোন-২: বাফার জোন (দক্ষিণাঞ্চলের সংরক্ষিত এলাকা)
- জোন-৩: জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা (শর্তসাপেক্ষে সম্পদ আহরণ)
- জোন-৪: সম্পূর্ণ সংরক্ষিত এলাকা (সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ)
বিপন্ন জীববৈচিত্র্য ও চ্যালেঞ্জ
CEGIS-এর গবেষক এইচ এম নুরুল ইসলাম বলেন, দ্বীপে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের নামে বিদেশি উদ্ভিদ রোপণ এবং অতিরিক্ত চিংড়ি আহরণের ফলে জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হয়ে পড়েছে। নৌযানের নোঙর কোরাল রিফ ধ্বংস করছে, যা এখনই রোধ করতে হবে।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফারহিনা আহমেদ, অতিরিক্ত সচিব ফাহমিদা খানম, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কামরুজ্জামান, পাশাপাশি মৎস্য, বন, কৃষি ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহের প্রতিনিধি এবং কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
পর্যটকদের সচেতনতা এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ততাই পারে সেন্ট মার্টিনকে বাঁচাতে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে—এমনটাই বলছে নতুন এই উদ্যোগ।



