
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের এক অপূর্ব ভান্ডার। কিন্তু এই সৌন্দর্যের পিছনে লুকিয়ে আছে গভীর উদ্বেগের ছায়া। সম্প্রতি দুই মাস ধরে এই দ্বীপে অবস্থান করে ফিরেছেন শরীফ সারওয়ার, একজন অভিজ্ঞ আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার এবং ডাইভমাস্টার। তাঁর অভিজ্ঞতা শুধু সাগরতলের মায়াবী দৃশ্যের কথা বলে না, বরং পরিবেশগত অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্রও তুলে ধরে। গত ১৯ নভেম্বর থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এই যাত্রায় তিনি স্কুবা ডাইভিংয়ের মাধ্যমে দ্বীপের জলতল এবং স্থলভাগের গভীরতা অন্বেষণ করেছেন, যা তাঁকে একই সঙ্গে মুগ্ধ করেছে এবং গভীর কষ্ট দিয়েছে।
শরীফ সারওয়ারের জীবন যেন সাগরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। ঢাকায় টানা কয়েকদিন থাকলেই তাঁর মনে হয়, যেন জলজ প্রাণী ডাঙায় আটকে পড়েছে। পানির জন্য ছটফটানি শুরু হয়ে যায়। গত আগস্ট মাসে তিনি প্রায় এক মাস মালদ্বীপে কাটিয়েছেন, সেখানে ডাইভমাস্টারের প্রশিক্ষণ নিয়ে সনদ অর্জন করেছেন। দেশে ফিরে মাত্র দুই মাস কাটার পর সেন্ট মার্টিন দ্বীপ খুলে দেওয়ার খবর পেয়ে তিনি তৎক্ষণাৎ যাত্রা শুরু করেন। ১৯ নভেম্বর ঢাকা ছেড়ে ২০ নভেম্বর তিনি পৌঁছান দ্বীপের পূর্ব বিচে। সেখানে তাঁর এক বন্ধুর স্কুবা ডাইভিং সেন্টার ‘স্কুবা টেক বিডি’ আছে, যা গত তিন বছর ধরে চালু। এই সেন্টারটি শুধু প্রশিক্ষণ দেয় না, রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের স্কুবা ডাইভিংয়ের সুযোগও প্রদান করে। শরীফ সেখানেই থাকার ব্যবস্থা করেন এবং তাঁর অন্বেষণ শুরু হয়।
২০১২ সাল থেকে শরীফ সেন্ট মার্টিনে আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফি করে আসছেন। বিগত কয়েক বছর তিনি বিভিন্ন সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু এবার সেই প্রতিষ্ঠানগুলো অনুমতি না পাওয়ায় তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক কাজের চাপ ছিল না। ফলে তিনি নিজের মতো নির্ভারভাবে দ্বীপটি অন্বেষণ করার সুযোগ পান। দিন-রাত যখন-তখন তিনি বেরিয়ে পড়তেন, দ্বীপের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে বেড়াতেন। স্কুবা ডাইভিং তো ছিলই তাঁর প্রধান কাজ। মাস্ক, স্নোরকেলসহ স্কুবার বেশির ভাগ সরঞ্জাম তাঁর সঙ্গে ছিল। সেন্টার থেকে শুধু স্কুবা ট্যাঙ্ক এবং কম্প্রেসর নিলেই চলত। পৌঁছানোর দিন সন্ধ্যায়ই তিনি পূর্ব বিচ থেকে ৩০০ মিটার দূরের সাগরে নেমে পড়েন। দুই মাসে তিনি দিন-রাত মিলিয়ে ২০-২৫ দিন ডাইভ করেছেন, যা তাঁকে সাগরতলের গভীর রহস্য উন্মোচন করতে সাহায্য করেছে।
ডাইভিংয়ের একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে ২৫ বা ২৬ নভেম্বর। স্কুবা ডাইভিংয়ের নিয়ম অনুসারে, অভিজ্ঞ একজন সহ-ডাইভার সঙ্গে নিয়ে ডুব দিতে হয়, এমনকি নিজে ডাইভমাস্টার হলেও। সেদিন দুজন মিলে সাগরে নামেন। সহ-ডাইভার এক ঘণ্টার মধ্যে উঠে আসেন, কিন্তু শরীফ পানির নিচেই থেকে যান। পানির অসাধারণ স্বচ্ছতা তাঁকে মোহিত করে। তিনি ছবি তুলতে থাকেন, অক্সিজেন যথেষ্ট ছিল এবং কোনো জটিলতা ছিল না। ফলে তিনি দীর্ঘ সময় কাটান। কিন্তু উপরে তখন হইচই পড়ে যায়। সবাই ধরে নেন যে তিনি কোনো দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। কোস্টগার্ডকে ডাকা হয় উদ্ধারের জন্য। শরীফ অবশ্য এসবের কিছুই জানতেন না। তিনি নিজের মতো ছবি তুলে যান। প্রায় তিন ঘণ্টা পর যখন তিনি উপরে উঠে আসেন, তখন দেখেন সৈকতে মানুষের ভিড়। সবাই তাঁকে উদ্ধার করতে এসেছে। এই ঘটনা তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: অন্যদের দুশ্চিন্তায় ফেলা উচিত নয়। প্রতিটি ডাইভ তাঁকে নতুন কিছু শেখায়, এটাও তার একটি অংশ।
সেন্ট মার্টিনের সাগরতলে এবার শরীফ নতুন কোনো সামুদ্রিক প্রাণীর দেখা পাননি, কিন্তু আগে দেখা অনেক মাছ, কোরাল এবং শেওলার আরও ভালো ছবি তুলেছেন। বিশেষ করে ব্রেন কোরালের ছবি তাঁকে মুগ্ধ করেছে। মানুষের মস্তিষ্কের মতো দেখতে এই কোরালের বৃদ্ধি অত্যন্ত ধীরগতির। বছরে মাত্র ১ থেকে ২ সেন্টিমিটার বাড়ে এটি। ফলে বড় আকারের ব্রেন কোরালের বয়স ৫০০ থেকে ৯০০ বছর বা তারও বেশি হয়। শরীফ যে ব্রেন কোরালের ছবি তুলেছেন, সেটি অত্যন্ত বড়—একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দুই হাত প্রসারিত করলে যতটা হয়, তার চেয়েও বড়। তাঁর ধারণা, এর বয়স কমপক্ষে ৫০০ বছর। এই কোরালগুলো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা সমুদ্রের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখে, অনেক প্রাণীর আশ্রয়স্থল হয়। এছাড়া এবার তিনি জেলিফিশের উপস্থিতি বেশি লক্ষ করেছেন, যা সাগরতলের জীবনচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফেদার ডাস্টার ওয়ার্ম এবং ছোট মাছগুলোর সঙ্গে কোরালের সম্পর্কও তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের সৌন্দর্য তুলে ধরে।
দিন-রাত সেন্ট মার্টিনের স্থলভাগ এবং সাগরতল পর্যবেক্ষণ করে শরীফ দেখেছেন, এবারের পানি আগের চেয়ে অনেক স্বচ্ছ। এক যুগের বেশি সময় ধরে দ্বীপটি পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, এমন স্বচ্ছতা আগে কখনো পাননি। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অক্টোবর মাসে পানি মালদ্বীপের মতো স্ফটিকস্বচ্ছ ছিল। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে যে সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ উন্নতি এবং পর্যটন নিয়ন্ত্রণের ফলে দূষণ কমার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তাতে শরীফের সায় নেই। তাঁর দীর্ঘদিনের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতায় এর কোনো প্রমাণ মেলেনি। রাতের অন্ধকারে কৃত্রিম আলোয় প্রবাল প্রাচীরগুলো যখন আলোকিত হয়, তখন এক মায়াবী দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। তিনি নিবিড়ভাবে দেখেছেন কোরালের টেন্টাকল বা কর্ষিকাগুলো কীভাবে খাদ্য গ্রহণ করে, নিশাচর প্রাণীদের জীবনযাত্রা। ক্যামেরায় ধরা পড়েছে ক্ষুদ্র প্রাণীদের বেঁচে থাকার লড়াই। কিন্তু এই সৌন্দর্যের পাশাপাশি তিনি দেখেছেন ভয়াবহ ছবি: পরিত্যক্ত জালের স্তূপ কোরালগুলোকে ঢেকে রেখেছে। এসব জাল প্রবালপ্রাচীরের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করছে, যা সামুদ্রিক জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি।
সাগরতলে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এখন অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে। স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলা এই প্লাস্টিক দানাগুলো কোরাল এবং অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষতি করছে। অতিরিক্ত পলি বা সেডিমেন্টেশনের কারণে কোরালগুলো শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে তারা সাদা হয়ে যাচ্ছে, যা ‘কোরাল ব্লিচিং’ নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়ায় কোরালগুলো যেন বাঁচার জন্য আর্তনাদ করছে। শুধু জলতল নয়, সৈকতে হাঁটতে গিয়ে শরীফ দেখেছেন অগণিত প্লাস্টিক সামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। দুই মাসে তিনি একাধিক অলিভ রিডলি কচ্ছপসহ অনেক সামুদ্রিক প্রাণীকে মৃত অবস্থায় সৈকতে পড়ে থাকতে দেখেছেন। গ্রামের অলিগলি থেকে সৈকতের বালু—সবখানেই প্লাস্টিকের অবাধ বিচরণ। আরও দুঃখজনক যে, গভীর রাতে দ্বীপে হাঁটতে বেরিয়ে তিনি দেখেছেন, অনেক রিসোর্ট এবং হোটেল তাদের বর্জ্য এবং ময়লা-আবর্জনা সৈকতের বালুতে পুঁতে ফেলছে। এই অসচেতনতা দ্বীপের পরিবেশকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সেন্ট মার্টিনের এই যাত্রা শরীফ সারওয়ারকে একই সঙ্গে মুগ্ধ করেছে এবং ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। সাগরতলের সৌন্দর্য, কোরালের দীর্ঘজীবী স্থিতিশীলতা এবং স্বচ্ছ পানির মায়া তাঁকে আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু পরিত্যক্ত জাল, প্লাস্টিক দূষণ, কোরাল ব্লিচিং এবং মৃত প্রাণীদের ছবি তাঁকে উদ্বিগ্ন করেছে। এই দ্বীপটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ হিসেবে সংরক্ষণের দাবি রাখে। পর্যটন নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সচেতনতা বাড়ানো না হলে এর জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাবে। শরীফের অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি তার সংরক্ষণও আমাদের দায়িত্ব। এই ছবিগুলো শুধু ফটোগ্রাফি নয়, একটি সতর্কবার্তা যা আমাদের সকলকে ভাবিয়ে তুলবে।



