২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সমুদ্র থেকে ঐতিহ্য পর্যন্ত: বছরজুড়ে পর্যটনের নতুন মানচিত্র গড়ে তুলছে হাই ফং

হাই ফং

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ভিয়েতনামের উত্তরাঞ্চলের বন্দরনগরী হাই ফং ধীরে ধীরে নিজেকে শুধু মৌসুমি সমুদ্রভিত্তিক গন্তব্য নয়, বরং সারা বছর সক্রিয় থাকা একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করছে। একসময় যেখানে পর্যটন মানেই ছিল গ্রীষ্মকাল, সৈকত আর দ্বীপভ্রমণ, সেখানে এখন হাই ফংয়ের পর্যটন চিত্র অনেক বেশি বিস্তৃত, গভীর এবং বৈচিত্র্যময়। সমুদ্র, দ্বীপ, বন, ঐতিহ্য, আধ্যাত্মিকতা ও স্থানীয় জীবনের অভিজ্ঞতা—সবকিছু মিলিয়ে শহরটি গড়ে তুলছে একটি বছরব্যাপী পর্যটন মডেল, যা ভিয়েতনামের পর্যটন কৌশলে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।

একীভূত প্রশাসনিক সম্প্রসারণের পর হাই ফংয়ের পর্যটন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। উপকূলীয় ও দ্বীপ অঞ্চল, ঐতিহাসিক স্থান, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে নতুনভাবে সাজানো হয় পর্যটন মানচিত্র। এর ফলে শহরটি কেবল নির্দিষ্ট মৌসুমে নয়, বরং চার ঋতুতেই পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। পর্যটন কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো “অফ-সিজন” ধারণা ভেঙে দিয়ে প্রতিটি ঋতুর জন্য উপযুক্ত ও অর্থবহ অভিজ্ঞতা তৈরি করা।

শীতকালীন পর্যটনের ক্ষেত্রেও হাই ফং ইতোমধ্যে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আগত পর্যটকরা এখন শীতকালেও ক্যাট বা দ্বীপ ও ল্যান হা উপসাগরকে বেছে নিচ্ছেন। ঠান্ডা আবহাওয়া, কম ভিড় এবং পরিষ্কার প্রকৃতি—এই তিনটি বিষয় শীতকালীন ভ্রমণকে আরও উপভোগ্য করে তুলেছে। অনেক পর্যটকই বলছেন, এই সময়ে সমুদ্র ও পাহাড়ের রঙ আরও স্পষ্ট দেখা যায়, বাতাসে থাকে এক ধরনের প্রশান্তি, যা ব্যস্ত মৌসুমে পাওয়া যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শীতকালেও রিসোর্ট, ক্রুজ ও পর্যটন সেবা চালু থাকায় ভ্রমণকারীদের অভিজ্ঞতায় কোনো ঘাটতি থাকে না।

হাই ফংয়ের পর্যটন বৈচিত্র্যের আরেকটি বড় দিক হলো আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক পর্যটন। কন সন–কিয়েট বাক ঐতিহাসিক অঞ্চলটি এখন বছরজুড়েই দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করছে। এই এলাকাটি শুধু ইতিহাসের স্মারক নয়, বরং প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। পাহাড়ঘেরা বনপথ, পাইন গাছের সারি, ঝরনার শব্দ আর প্রাচীন মন্দির—সব মিলিয়ে এখানে প্রতিটি ঋতু ভিন্ন অনুভূতি এনে দেয়। শীতের কুয়াশা, বসন্তের সবুজ, বর্ষার স্নিগ্ধতা কিংবা শরতের পরিষ্কার আকাশ—প্রতিটি সময়েই কন সন–কিয়েট বাক নতুনভাবে ধরা দেয়।
এই ধরনের গন্তব্যগুলো হাই ফংয়ের পর্যটনকে শুধু ভ্রমণ বা বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না, বরং একটি আবেগগত অভিজ্ঞতায় রূপ দিচ্ছে। পর্যটকরা এখানে এসে শুধু দৃশ্য উপভোগ করেন না, বরং স্থানীয় ইতিহাস, কিংবদন্তি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত হন। পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, এই সংযোগই বছরব্যাপী পর্যটনের মূল শক্তি। কারণ, আবহাওয়ার পরিবর্তন হলেও ইতিহাস ও সংস্কৃতির আবেদন কখনো ফুরিয়ে যায় না।

পর্যটন অক্ষ সম্প্রসারণের ফলে হাই ফং এখন একাধিক থিমভিত্তিক পর্যটন পণ্য গড়ে তুলতে পারছে। সমুদ্র ও দ্বীপভিত্তিক বিলাসবহুল ক্রুজ, চার ঋতু খোলা থাকা রিসোর্ট, পাহাড় ও বনভিত্তিক ট্রেকিং, গ্রামীণ জীবন অভিজ্ঞতা, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প গ্রাম ভ্রমণ—সবকিছু মিলিয়ে পর্যটকদের সামনে খুলে যাচ্ছে বহু বিকল্প। এই বৈচিত্র্যই হাই ফংকে অন্য অনেক গন্তব্যের থেকে আলাদা করছে।
ভিয়েতনামের সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, দ্বীপপুঞ্জ, সমুদ্র, জাতীয় পর্যায়ের ঐতিহ্যবাহী আধ্যাত্মিক স্থান এবং একটি সক্রিয় বন্দরনগরী—এই চারটি উপাদান একসঙ্গে থাকা সত্যিই বিরল। সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হাই ফং উত্তর ভিয়েতনাম তো বটেই, পুরো দেশের একটি প্রধান বছরব্যাপী পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

শহর কর্তৃপক্ষ ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ২৫ মিলিয়ন পর্যটককে স্বাগত জানানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বছরব্যাপী পর্যটন পণ্য উন্নয়ন। নীতিনির্ধারকদের ভাষায়, বছরব্যাপী পর্যটন মানে শুধু ক্যালেন্ডারের সব দিনে গন্তব্য খোলা রাখা নয়; বরং প্রতিটি ঋতুর জন্য আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করা। শীতের জন্য শান্ত প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক ভ্রমণ, গ্রীষ্মের জন্য সমুদ্র ও দ্বীপ, বর্ষার জন্য সবুজ বন ও জলপ্রবাহ, আর শরতের জন্য সাংস্কৃতিক উৎসব—এইভাবে মৌসুমকে সমস্যা নয়, বরং সুযোগ হিসেবে দেখার কৌশলই এখানে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

এই মডেলের আরেকটি বড় সুবিধা হলো স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবিকার স্থিতিশীলতা। মৌসুমি পর্যটনের কারণে অনেক এলাকায় বছরের একাংশে আয় বেশি হলেও বাকি সময়ে কর্মসংস্থান কমে যায়। বছরব্যাপী পর্যটন চালু হলে স্থানীয় মানুষ পর্যটন থেকে নিয়মিত আয়ের সুযোগ পান। হোটেল কর্মী, গাইড, নৌচালক, কারুশিল্পী, কৃষক—সবাই এই ধারাবাহিক পর্যটন প্রবাহ থেকে উপকৃত হন। ফলে পর্যটন শুধু দর্শনার্থীদের জন্য নয়, বরং স্থানীয় সমাজের জন্যও টেকসই হয়ে ওঠে।

বেসরকারি পর্যটন খাতও এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। ট্রাভেল কোম্পানিগুলোর মতে, আধুনিক পর্যটক এখন শুধু ছবি তোলার জায়গা খোঁজেন না; তারা জানতে চান স্থানীয় মানুষের জীবন, খাবার, সংস্কৃতি ও গল্প। হাই ফংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক গভীরতা এই চাহিদা পূরণে সক্ষম। তবে বাজারে টিকে থাকতে হলে শহরটিকে আরও নতুন, সৃজনশীল এবং স্বতন্ত্র পর্যটন পণ্য আনতে হবে, যাতে অভিজ্ঞতাগুলো সত্যিই আলাদা হয়ে ওঠে।

হাই ফংয়ের বছরব্যাপী পর্যটন যাত্রা তাই শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং একটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। একদিকে নীল সমুদ্র ও প্রাণবন্ত দ্বীপজীবন, অন্যদিকে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য ও শান্ত বনভূমি—এই দুই বিপরীত অনুভূতির সমন্বয়ই শহরটির শক্তি। পর্যটকরা যে কোনো সময় এসে এখানে কিছু না কিছু আবিষ্কার করতে পারেন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণ তাদের সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রেখে আধুনিক পর্যটনের অংশ হতে পারেন।

সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হাই ফংয়ে পর্যটকের সংখ্যা ১৪ মিলিয়নের বেশি ছাড়াতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। এই প্রবণতা প্রমাণ করে যে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি গন্তব্য সঠিক পরিকল্পনা পেলে সারা বছরই আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। হাই ফং সেই পথেই এগোচ্ছে—ধীরে, পরিকল্পিতভাবে, কিন্তু দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে।

Read Previous

সুন্দরবনের করমজলে পর্যটকবাহী জাহাজ দুর্ঘটনা, কোস্ট গার্ডের দ্রুত উদ্ধার অভিযান

Read Next

শিমান্তো ব্যাংক ও নভোএয়ারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক, কার্ডধারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular