
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : শীতের সকালের কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে গেলে পুব আকাশে যখন রোদ উঁকি দেয়, তখন মানিকগঞ্জের চরাচর যেন মুহূর্তেই রূপ বদলে ফেলে। একপাশে সবুজ, আরেকপাশে হলুদের মেলবন্ধনে তৈরি হয় এক অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্যপট। মাঠের পর মাঠ জুড়ে ফোটা সরিষা ফুলে ঢেকে যায় দিগন্ত, মাঝখান দিয়ে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ এগিয়ে চলে গ্রামবাংলার বুক চিরে। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, প্রকৃতি বুঝি নিজ হাতে হলুদ রঙের বিশাল এক চাদর বিছিয়ে দিয়েছে মাটির গায়ে। এই সোনালি সৌন্দর্য দেখতে এখন রাজধানীর কাছের জেলা মানিকগঞ্জে বাড়ছে দর্শনার্থীদের আনাগোনা।
ঢাকার খুব কাছেই অবস্থান হলেও মানিকগঞ্জ এখনো গ্রামীণ স্বাভাবিকতা ধরে রেখেছে। শীত এলেই জেলার ঘিওর, দৌলতপুর, হরিরামপুর, সাটুরিয়া, সিংগাইর ও শিবালয়সহ প্রায় সব উপজেলায় সরিষা চাষ হয় ব্যাপকভাবে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির শুরুতে এসব খেত ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। বাতাসে ভেসে বেড়ায় সরিষা ফুলের হালকা ঝাঁঝালো গন্ধ, তার সঙ্গে যোগ হয় মৌমাছির গুনগুন শব্দ। পুরো এলাকা তখন এক ধরনের প্রাণবন্ত নীরবতায় ডুবে থাকে, যা শহুরে কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে স্বস্তি খুঁজতে আসা মানুষের মন ছুঁয়ে যায় সহজেই।
সরিষাখেতের সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা। শীতের ভোরে অনেক জায়গায় এখনো দেখা যায় খেজুরগাছ থেকে রস নামানোর দৃশ্য। কুয়াশা ভেজা সকালে গাছিরা হাঁড়ি নামিয়ে আনছেন, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যটকেরা সেই টাটকা রসের স্বাদ নিচ্ছেন। এই অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই নতুন, আবার অনেকের শৈশবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
দুপুরের দিকে মানিকগঞ্জের নদীকেন্দ্রিক জীবনও পর্যটকদের টানে। ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে গিয়ে শীতল হাওয়ায় কিছু সময় কাটানো যায়। কোথাও কোথাও নৌকায় চড়ে নদীর বুক চিরে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগও মেলে। নদীর শান্ত জল, দূরে সরিষাখেত আর নীল আকাশ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক প্রশান্ত পরিবেশ।
এ সময় জেলার বিভিন্ন এলাকায় মৌচাষও চোখে পড়ে। সরিষা ফুলের মৌসুম মানেই মধু সংগ্রহের ব্যস্ততা। অনেক খেতের পাশে সারি সারি মৌচাষের বাক্স বসানো থাকে। মৌয়ালদের কাজের দৃশ্য দেখতে থেমে যান অনেক দর্শনার্থী। কেউ কেউ খাঁটি সরিষার মধুও কিনে নিচ্ছেন স্মৃতি হিসেবে।
শীতের ভ্রমণ মানেই পিঠাপুলি, আর মানিকগঞ্জ এ ক্ষেত্রে মোটেও পিছিয়ে নেই। বাসস্ট্যান্ড, বাজার কিংবা গ্রামের মোড়ে মোড়ে দেখা যায় চিতই, ভাপা, পাটিসাপটা আর নানা ধরনের পিঠার দোকান। গুড়ের মিষ্টি গন্ধ আর ভর্তার ঝাঁঝালো স্বাদ ভ্রমণের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেক পর্যটকই বলেন, সরিষাখেত দেখার পাশাপাশি এই খাবারের স্বাদই তাদের বারবার টেনে আনে।
ঘুরে দেখার জন্য মানিকগঞ্জের কয়েকটি এলাকা বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ঢাকা–আরিচা মহাসড়কের দুপাশে বিস্তৃত সরিষাখেত সহজেই নজর কাড়ে। গাবতলী থেকে বাসে নেমে বানিয়াজুরী, মহাদেবপুর বা ঘিওর এলাকায় নামলেই চোখের সামনে খুলে যায় হলুদ প্রান্তরের দৃশ্য। ঘিওরের রাথুরা চক এলাকায় বিশাল মাঠজুড়ে সরিষার সমারোহের পাশাপাশি স্থানীয় খাবারের দোকানও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সিংগাইর ও ঝিটকা অঞ্চলে গেলে নদী আর মাঠের মিলিত সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। সাটুরিয়ায় সরিষাখেতের পাশাপাশি দেখা যায় ঐতিহাসিক বালিহাটি জমিদারবাড়ি, যা ভ্রমণে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।
যাতায়াতের দিক থেকেও মানিকগঞ্জ বেশ সুবিধাজনক। ঢাকা থেকে দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই বাস কিংবা ব্যক্তিগত গাড়িতে পৌঁছানো যায়। জেলার ভেতরে চলাচলের জন্য রয়েছে বাস, সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। ফলে স্বল্প সময়ের ভ্রমণ পরিকল্পনার জন্য মানিকগঞ্জ এখন অনেকের প্রথম পছন্দ।
তবে এই সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। সরিষাখেতে ছবি তুলতে গিয়ে অনেক সময় ফসলের ক্ষতি হয়। কৃষকেরা অনুরোধ করছেন, কেউ যেন খেতের ভেতর না হাঁটে বা ফুল না ছেঁড়ে। কারণ এই ফসলের ওপরই নির্ভর করে তাদের সারা বছরের আয়।
সব মিলিয়ে শীতের এই সময়ে মানিকগঞ্জ যেন প্রকৃতির এক উন্মুক্ত প্রদর্শনী। সোনালি সরিষাখেত, নদী, গ্রামীণ জীবন আর স্থানীয় খাবারের স্বাদ—সব একসঙ্গে উপভোগ করতে চাইলে মানিকগঞ্জ হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে, প্রকৃতির কাছাকাছি এসে নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



