১৩/০৫/২০২৬
৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শাহজালাল বিমানবন্দরে লাগেজ দুর্ভোগ: যাত্রীদের অপেক্ষা ও ভোগান্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে ফেরা যাত্রীদের জন্য লাগেজ সংগ্রহ এখন একটি দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। উড়োজাহাজ অবতরণের পর ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করলেও লাগেজ বেল্টে আসতে প্রায়ই ৪৫ মিনিট থেকে দেড় ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষা বিশেষ করে বয়স্ক যাত্রী, নারী ও শিশুদের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাত্রী ও এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অনুসারে, বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা, জনবলের অভাব এবং সমন্বয়হীনতা এই সমস্যার মূলে রয়েছে।

সম্প্রতি আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে আসা একাধিক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই দুর্ভোগ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। নিউ ইয়র্ক থেকে ফেরা জেসমিন রেজা জানান, কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে অবতরণের পর লাগেজ পেতে তাঁকে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তির ওপর এই অপেক্ষা তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক ছিল। একইভাবে, সাউদিয়া এয়ারলাইনসের জেদ্দা ফ্লাইটে আসা এজাজ আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী রিনা লাগেজ পেতে এক ঘণ্টা ৫০ মিনিট সময় ব্যয় করেন। এজাজ আহমেদ বলেন, “লম্বা জার্নি শেষে বিমানবন্দরে আবার দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা সত্যিই অমানবিক।”

দুবাই থেকে আসা বজলুর রহমানের অভিজ্ঞতাও একই রকম। তিনি জানান, নির্ধারিত বেল্টে লাগেজ না আসায় দুবার ফিরে আসতে হয়েছে এবং তৃতীয়বারে লাগেজ পেয়েছেন। “বিদেশে গেলে ইমিগ্রেশন শেষ করেই লাগেজ পাওয়া যায়, কিন্তু দেশে ফিরে এই স্লো প্রসিডিউর হতাশাজনক,” বলেন তিনি। যাত্রীদের অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। লাগেজ কাটা, মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি, বেল্ট পরিবর্তন এবং অপ্রয়োজনীয় দেরির ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। এসব সমস্যা শুধু যাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি বাড়াচ্ছে না, বিদেশি পর্যটক ও প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করছে।

অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে একটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের লাগেজ ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে বেল্টে পৌঁছানো উচিত। আইকাও (আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা) এর সুপারিশ অনুযায়ী, বিমানের ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যে প্রথম ব্যাগ এবং সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের মধ্যে সব লাগেজ ডেলিভারি সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু শাহজালালে এই নিয়ম মানা হচ্ছে না। পুরোনো অবকাঠামো, সীমিত যন্ত্রপাতি, ব্যাগেজ ট্রলি ও কনভেয়ার সিস্টেমের অভাব এবং গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্টের ঘাটতি এর প্রধান কারণ। অনেক সময় যন্ত্রপাতি বিকল হলে পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ফ্লাইটগুলোতে বড় এয়ারক্রাফট ও অধিক যাত্রী থাকায় লাগেজের পরিমাণ বেশি হয়। একসঙ্গে তিনটির বেশি কনটেইনার আনা সম্ভব হয় না। তবে যাত্রীরা মনে করেন, এটি শুধুমাত্র যাত্রীসংখ্যার সমস্যা নয়, ব্যবস্থাপনারও ব্যর্থতা। নভো এয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, “পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশে যাত্রীরা দ্রুত লাগেজ পান। বাংলাদেশে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্বে থাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উচিত এ সমস্যা দ্রুত সমাধান করা।”

বাংলাদেশ এয়ারলাইনস পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ক্যাপ্টেন হেলাল জানান, সকালের দিকে একাধিক ফ্লাইট একসঙ্গে অবতরণ করলে চাপ বেড়ে যায়। শাহজালালের ধারণক্ষমতার চেয়ে বর্তমানে অনেক বেশি যাত্রী এখানে আসছেন। টো-ট্রাক্টরসহ প্রয়োজনীয় যানবাহনের স্বল্পতাও রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, থার্ড টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে আধুনিক ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেমের কারণে এ সমস্যা অনেকাংশে কমবে।

এদিকে বিমানবন্দরের টয়লেটগুলোর নোংরা অবস্থাও যাত্রীদের অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। মহিলা টয়লেটে ফ্লোরে পানি ও টিস্যু পড়ে থাকা, দুর্গন্ধ এবং অপরিচ্ছন্ন কমোড নিয়মিত অভিযোগের বিষয়। সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে হজ ফ্লাইট চলায় কিছু জনবল হজ ক্যাম্পে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। ফলে সাময়িক জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। তবে হজ ফ্লাইট শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশাবাদী।

বিমানবন্দরের প্রধান নির্বাহী গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ বলেন, ক্লিনাররা সবসময় টয়লেট পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করছেন। তবে কিছু যাত্রী সঠিকভাবে ব্যবহার না করায় সমস্যা দেখা দেয়। লাগেজের ক্ষেত্রেও বড় এয়ারক্রাফটের কারণে সময় বেশি লাগে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এই চলমান সমস্যা শুধু যাত্রীদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, জাতীয় অর্থনীতি ও পর্যটন খাতের জন্যও ক্ষতিকর। প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ফিরে এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলে বিনিয়োগ ও দেশে ফেরার আগ্রহ কমে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ জনবল নিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। থার্ড টার্মিনাল চালুর পাশাপাশি বর্তমান টার্মিনালগুলোর ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন না আনলে যাত্রী ভোগান্তি কমবে না।

শাহজালাল বিমানবন্দর দেশের প্রবেশদ্বার। এখানকার সেবার মান উন্নত না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, পর্যটক ও প্রবাসীদের আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়বে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপই পারে এই দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করতে। অন্যথায়, লাগেজ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা যাত্রীদের জন্য ‘স্বাগতম’ এর পরিবর্তে ‘দুর্ভোগের’ প্রতীক হয়ে থাকবে।

প্রতিবেদক : অমিত চন্দ্র দাস

Read Previous

ইইউ চালু করছে ‘এক যাত্রা, এক টিকিট’ নীতি, ট্রেন ভ্রমণ সহজ হবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular