
পেডেল স্টিমার
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের নদীমাতৃক ইতিহাসে প্যাডেল স্টিমারগুলোর একটি বিশেষ আবেগ আছে। এগুলো শুধু পরিবহন মাধ্যম ছিল না, বরং ছিল নদী সংস্কৃতির অংশ, সময়ের সাক্ষী এবং প্রজন্মের স্মৃতিতে জড়িয়ে থাকা চলমান ঐতিহ্য। সেই ঐতিহ্যকেই আবার জীবন্ত করে ফিরেছে শতবর্ষী প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ। দীর্ঘ সংস্কার শেষে এবার এটি পর্যটনের উদ্দেশ্যে নতুন রূপে যাত্রা শুরু করছে—পুরোনো দিনের অনুভূতি আর আধুনিক আরামের সুন্দর মিশেলে।
যারা নদীর ওপরে ভেসে থাকা পুরোনো স্টিমারের শব্দ, ছন্দ আর ধীর গতির যাত্রার মধ্যে এক ধরনের শিকড়-ছোঁয়া রোমাঞ্চ খুঁজে পান, তাদের কাছে এটা নিঃসন্দেহে বড় সুখবর।
অতীতকে ছুঁয়ে আধুনিকতার পথে
পিএস মাহসুদকে নতুনভাবে চালুর মূল উদ্দেশ্যই ছিল একদিকে ঐতিহ্য রক্ষা, অন্যদিকে পর্যটনকে নতুন মাত্রা দেওয়া। এজন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) স্টিমারের পুরোনো রূপ, ধাতব কাঠামো এবং ক্লাসিক নকশা যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রেখেছে। কিন্তু যাত্রীদের অভিজ্ঞতা আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে প্রয়োজনীয় সব আধুনিক সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে।
সংস্কারের পর স্টিমারটিতে এখন আছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিন, প্রশস্ত ডেক, প্যানোরামিক ভিউ পয়েন্ট এবং ডিজিটাল নেভিগেশন সিস্টেম। নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বদলে গেছে: আধুনিক লাইফবোট, অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র, জিপিএস ট্র্যাকিং—সবকিছু যুক্ত করা হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে।
নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন, মাহসুদকে পর্যটনের উদ্দেশ্যে চালু করা শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং নদী সংস্কৃতির স্মৃতি রক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তার ভাষায়, “এই স্টিমার মানুষকে মনে করিয়ে দেবে, নদীই ছিল দেশের যোগাযোগ, ব্যবসা আর জীবনধারার মূল সেতু।”
ঢাকা–বরিশাল রুটে নতুন অভিজ্ঞতা
মাহসুদের নতুন ভ্রমণসূচী পর্যটকদের জন্য বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে। চলাচলের দিন দুটি—শুক্রবার ও শনিবার।
- শুক্রবার: ঢাকা থেকে বরিশাল
- শনিবার: বরিশাল থেকে ঢাকা
- যাত্রা শুরুর সময়: সকাল ৮টা
- পৌঁছানোর সময়: রাত
পুরোনো স্টিমারগুলো সাধারণত রাতের যাত্রার জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু এবার দিনের বেলায় ভ্রমণের মাধ্যমে পর্যটকেরা নদীর দুই পাড়ের গ্রামীণ জীবন, খেয়া নৌকার ব্যস্ততা, চরাঞ্চল আর জেলেদের দিনের কর্মযজ্ঞ—সবকিছু চোখের সামনে দেখতে পারবেন। দিনের আলোয় নদীভ্রমণের এই অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা।
নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য গাছপালা, মাঝেমধ্যে দেখা মেলে ঐতিহ্যবাহী পালতোলা নৌকা—এসব মিলিয়ে এটি কেবল একটি যাত্রা নয়, বরং নীরব দৃশ্যপটের মাঝে এক ধীর গতির ভ্রমণ।
পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়ার বড় পরিকল্পনা
পিএস মাহসুদের পুনর্বাসনকে আলাদা কোনো প্রকল্পের মতো দেখছে না সরকার। বরং এটি নদীভিত্তিক পর্যটন বিস্তারের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ। নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে, পিএস অস্ট্রিচ, পিএস লেপচা এবং পিএস টার্ন—এই তিনটি পুরোনো প্যাডেল স্টিমারও সংস্কারের আওতায় আনা হতে পারে।
যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দেশের পর্যটনে নতুন ঝলক চান, তাঁদের জন্য এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা। বাংলাদেশের নদীপথ বিশাল, সমৃদ্ধ এবং গল্পে ভরা। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে পর্যটনে পরিণত করার উদ্যোগ এতদিন খুব ধীরগতির ছিল। পিএস মাহসুদের প্রত্যাবর্তন সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার একটি সার্থক শুরু।
ভ্রমণে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সচেতনতা
নৌপরিবহনে নিরাপত্তার প্রশ্নটি সবসময়ই আলোচনায় থাকে। এ কারণে স্টিমারটির যান্ত্রিক অংশ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে আপডেট করা হয়েছে। কম-নির্গমন ইঞ্জিন যুক্ত হওয়ায় জাহাজটি পরিবেশবান্ধব হয়েছে, যা নদীর পরিবেশগত চাপ কমাতে সহায়ক হবে।
একদিকে নিরাপত্তার উন্নতি, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার—এই দুই মিলেই মাহসুদের নতুন রূপটিকে আরও সময়োপযোগী করে তুলেছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা
স্যাডারঘাটে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকার ও নৌপরিবহন খাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফী সিদ্দিকী, নৌপরিবহন সচিব ড. নুরুন নাহার চৌধুরী সহ অনেকেই মাহসুদের এই নতুন যাত্রাকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের এক ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেছেন।
যারা নদীকে ভালোবাসেন, ইতিহাসে হাত রাখতে চান বা ভিন্নস্বাদের ভ্রমণ খুঁজছেন—প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদের পুনর্জন্ম তাদের জন্য এক বড় সুযোগ। এটি নদীপথকে শুধু জীবন্ত করছে না, বরং মনে করিয়ে দিচ্ছে আমাদের শিকড় কোথায়। একই সঙ্গে দেশের পর্যটন খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে এই উদ্যোগ।
বাংলাদেশের নদী ঐতিহ্যকে যেভাবে আধুনিক রূপে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিকল্পনার ইঙ্গিত। আর পিএস মাহসুদ সেই যাত্রার প্রথম আলো।



