
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে, সবুজ শ্যামল মাঠ আর সরু আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় এক বিস্ময়কর স্থানে—তিনবিঘা করিডোরে। নামের মতোই ছোট্ট এই জমি, কিন্তু এর ইতিহাস আর তাৎপর্য বিশাল। একসময় যা ছিল সীমান্ত রাজনীতির জটিলতার প্রতীক, আজ তা দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের সেতুবন্ধন হিসেবে।
করিডোরের ইতিহাস ও অবস্থান
তিনবিঘা করিডোর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মেখলিগঞ্জ ও বাংলাদেশের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ইউনিয়নের মাঝামাঝি। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭৮ মিটার, প্রস্থ ৮৫ মিটার। ২০১১ সালে ইজারার মাধ্যমে এটি বাংলাদেশকে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। এর ফলে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের মানুষ সরাসরি দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। সীমান্তের কড়াকড়ি পেরিয়ে এখানকার মানুষ এখন সহজে যাতায়াত করতে পারে, আর ভ্রমণপিয়াসীরা পায় ইতিহাস ছুঁয়ে দেখার সুযোগ।
যাত্রাপথের অভিজ্ঞতা
ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে পাটগ্রাম পৌঁছাতে লাগে প্রায় আট ঘণ্টা। রংপুর থেকেও চার ঘণ্টার পথ। পাটগ্রাম উপজেলা সদর থেকে অটোরিকশা বা রিকশায় নয় কিলোমিটার গেলেই তিনবিঘা করিডোরে পৌঁছে যাওয়া যায়। পথের ধারে সবুজ ক্ষেত, গ্রামীণ জনপদ আর সীমান্ত জীবনের সহজ-সরল দৃশ্য চোখে পড়বে। ভ্রমণের শুরুতেই মনে হবে, আপনি যেন গ্রামীণ সৌন্দর্যের এক অন্য রকম গ্যালারিতে হাঁটছেন।
করিডোরের চারপাশে যা দেখার মতো
করিডোরের কাছে দাঁড়িয়ে দূরে তাকালেই চোখে পড়বে সবুজ শস্যখেত, গাছপালা আর গ্রামীণ জীবনের সরল ছন্দ। করিডোরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ, যা দর্শনার্থীদের মনে জাগায় স্বাধীনতার স্মৃতি। কাছেই আছে দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, পুরনো স্থাপত্যের ছোঁয়া মেলে সেখানে। আরেকটু ঘুরলেই চোখে পড়বে কামতেশ্বরী মন্দির ও মাধবমোহন মন্দির, যেগুলো এখনো স্থানীয় সংস্কৃতি আর ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
থাকার জায়গা ও খাবারের ব্যবস্থা
রাত কাটানোর জন্য দহগ্রামে ছোট্ট একটি হোটেল—হোটেল সাদিক। পাটগ্রাম বা লালমনিরহাট শহরে তুলনামূলক ভালো আবাসিক হোটেল পাওয়া যায়। খাবারের জন্য যেতে হবে পাটগ্রাম সদরে। আনন্দ রেস্তোরাঁ, হোটেল পদ্মা কিংবা স্থানীয় ছোট দোকানগুলোতে মিলবে ভাত-ভর্তা, মাছ কিংবা দেশি সুস্বাদু খাবার। সীমান্তের কাছে দাঁড়িয়ে এক কাপ চায়ের স্বাদও কিন্তু ভ্রমণের আনন্দকে অন্য মাত্রা দেয়।
ভ্রমণকারীদের জন্য টিপস
তিনবিঘা করিডোর সীমান্তবর্তী এলাকা। তাই ঘোরার সময় সচেতন থাকা জরুরি। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নিয়মকানুন মেনে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ। আর ভ্রমণে গেলে সময় নিয়ে চারপাশের প্রকৃতি ও স্থানীয় মানুষের জীবনধারা অনুভব করতে ভুলবেন না।
কেন যাবেন তিনবিঘায়?
তিনবিঘা করিডোর শুধু ইতিহাসের জায়গা নয়, এটি প্রকৃতি, মানুষ আর সংস্কৃতির এক অসাধারণ মেলবন্ধন। সীমান্তের সরল গ্রামবাংলা, মুক্ত আকাশের নিচে শস্যক্ষেতের সবুজ সমুদ্র আর ইতিহাসের গন্ধ মিলেমিশে এখানে তৈরি করেছে এক ভিন্ন আবহ। যারা ইতিহাস, প্রকৃতি আর ভিন্ন অভিজ্ঞতা খুঁজে বেড়ান, তাদের জন্য লালমনিরহাটের এই ছোট্ট করিডোর হতে পারে এক বড় ভ্রমণ স্মৃতি।
‘পর্যটন সংবাদ’ পাঠকদের জন্য পরামর্শ—যদি কখনো রংপুর বা লালমনিরহাটে ঘুরতে যান, সময় করে অবশ্যই একবার তিনবিঘা করিডোর ঘুরে আসুন। এখানে দাঁড়িয়ে আপনি যেমন ইতিহাস ছুঁয়ে দেখতে পারবেন, তেমনি প্রকৃতির রঙিন ছায়াতেও হারিয়ে যাবেন।



