মৌলভীবাজারের আজমেরু: পাখিদের স্বর্গরাজ্য, গ্রামীণ পর্যটনের নতুন ঠিকানা

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: ভোরের আলো ফুটতেই মৌলভীবাজারের গ্রামীণ সড়ক ধরে হাঁটলে চোখে পড়ে এক অন্য রকম দৃশ্য। দুই পাশে ধানের ক্ষেতে সদ্য রোপণ করা আমনের চারা। সোনালি রোদ পড়ছে জলে, পাতার ফাঁকে হাওয়ার সঙ্গে দুলছে সবুজ ঢেউ। ধানক্ষেতের মাঝেমধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সাদা বক, কখনো দল বেঁধে বিশ–ত্রিশটি, আবার কখনো একা দুটো। এ যেন বাংলার প্রকৃতির নিজস্ব ছায়াছবি।

ফুল নয়, গাছে গাছে পাখি

এই শান্ত সকালের ভেতরেই হঠাৎ চোখে পড়ে এক বিস্ময়। দূর থেকে মনে হয়—গাছে গাছে সাদা কাঠগোলাপ ফুটে আছে। কাছে গেলে দেখা যায়, আসলে সেগুলো শত শত সাদা বক। গাছের ডালে ডালে, পাতার আড়ালে, মাথার ওপরে সর্বত্রই তাদের উপস্থিতি। শুধু বক নয়, আছে পানকৌড়ি, শালিক, দোয়েলসহ নানা পাখির দল।

আজমেরু গ্রামের এই বাড়িটি এখন পাখিদের স্থায়ী আশ্রয়। বাড়ির পশ্চিম দিকের পুকুরপাড়ে সারি সারি আম, তেঁতুল, সুপারি, লেবু ও কদম গাছ। প্রতিটি গাছ যেন এখন পাখিদের সংসার। গাছের প্রতিটি কোণে বাসা, কোনো বাসায় ডিম, কোনো বাসায় ছানা। মা-বাবা পাখিরা সারাদিন খাবার সংগ্রহ করে এনে ছানাদের খাওয়াচ্ছে।

মানুষ আর পাখির সহাবস্থান

বাড়ির কর্তা মো. এরশাদ মিয়া প্রায় এক দশক ধরে এই পাখিদের আগলে রেখেছেন। তাঁর ভাষায়,
“অনেকবার দেখছি, রাতে ডাক শুনে বাইরে গেছি। কেউ পাখি শিকার করতে এলে তাড়াইছি। মনে হয় এরা আমার ঘরের মানুষ। তাদের ছাড়া বাড়ি ফাঁকা লাগে।”

এরশাদ মিয়ার পরিবারই শুধু নয়, গ্রামের মানুষও পাখিদের নিজেদের সম্পদ মনে করেন। স্থানীয় মাদ্রাসাছাত্র তারেক প্রায়ই এখানে আসে। সে বলে,
“আমরা যখন স্কুল থেকে ফিরি, দেখি পাখিগুলো ডাকাডাকি করছে। মনে হয় গ্রামটাই যেন জেগে উঠেছে। কেউ কখনো বিরক্ত করে না, কারণ সবাই ভাবে এরা আমাদেরও।”

প্রকৃতির উন্মুক্ত প্রদর্শনী

বাড়ির চারপাশে খোলা মাঠ আর পূর্বদিকে বিস্তৃত খাইঞ্জার হাওর। এই পরিবেশেই বকেরা স্বাচ্ছন্দে সংসার গড়ে তুলেছে। সকালে ভোরের আলো ফুটতেই তারা দল বেঁধে হাওর কিংবা মাঠের দিকে উড়ে যায়। সারাদিন শিকার করে সন্ধ্যার আগে আবার ঝাঁক বেঁধে ফিরে আসে। আকাশ ভরে ওঠে সাদা ডানার ছটায়।

বিশেষ করে কার্তিক মাসে পাখির সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে, প্রতিটি গাছ যেন সাদা ফুলে ঢাকা পড়ে। গ্রামের প্রবীণরা বলেন, এ সময় ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামজুড়ে শুধু পাখির ডাক আর ডানার শব্দ শোনা যায়।

চ্যালেঞ্জ আর ভালোবাসা

প্রচুর পাখি থাকার কারণে বাড়ির পশ্চিম দিকে হাঁটার উপায় নেই। গাছতলা সাদা হয়ে যায় বকের বিষ্ঠায়। তবু বাড়ির লোকজনের এতে কোনো অভিযোগ নেই। বরং তাঁরা এটিকে প্রকৃতির দান হিসেবেই দেখেন। এরশাদ মিয়ার কথায়,
“যত কষ্টই হোক, পাখিদের ছাড়া থাকতে পারব না। এরা আমাদের আত্মীয়ের মতো।”

পর্যটনের সম্ভাবনা

আজমেরুর এই বাড়ি শুধু একটি গ্রামীণ বসতবাড়ি নয়, প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এটি এক জীবন্ত অভয়ারণ্য। যারা মৌলভীবাজারে চা-বাগান বা হাওর দেখতে আসেন, তারা চাইলে আজমেরুর এই পাখির গ্রাম ঘুরে যেতে পারেন।

এখানে পর্যটনের অসাধারণ সম্ভাবনা আছে। প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখতে চাইলে বা পাখি-প্রেমী ভ্রমণকারীদের জন্য এই জায়গা হতে পারে আকর্ষণীয় একটি গন্তব্য। স্থানীয়রা বলেন, যদি সঠিকভাবে পরিচর্যা করা যায় তবে এটি বাংলাদেশের অন্যতম গ্রামীণ ইকোট্যুরিজম স্পট হয়ে উঠতে পারে।

প্রকৃতির শিক্ষা

আজমেরুর এই বাড়ির গাছে গাছে বকের সংসার যেন এক জীবন্ত শিক্ষা দেয়—প্রকৃতিকে রক্ষা করলে প্রকৃতি মানুষের ঘরে এসে সংসার গড়ে তোলে। পাখিদের সঙ্গে মানুষের এই সহাবস্থান শুধু একটি গ্রামের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের প্রকৃতি ও সংস্কৃতিরও প্রতিচ্ছবি।

প্রতিবেদন : নাদিয়া আক্তার

Read Previous

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুঁজিবাজারে প্রতারণা, বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করল বিএসইসি

Read Next

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হওয়ার প্রলোভনে ২০০ কোটি টাকার চেক: এনআইসিআরএইচ-এর সাবেক পরিচালক ডা. মোস্তফার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular