মেক্সিকোর হার্মোসিলোতে ডিসকাউন্ট স্টোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২৩ জনের মৃত্যু

ছবি: সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : মেক্সিকোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সোনোরা রাজ্যের রাজধানী হার্মোসিলো শহর এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী হলো। শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি জনপ্রিয় ডিসকাউন্ট স্টোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় শনিবার (১ নভেম্বর) দুপুরে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে, যখন দেশজুড়ে পালিত হচ্ছিল ঐতিহ্যবাহী ‘ডে অব দ্য ডেড’ উৎসবের ছুটির সপ্তাহান্ত। উৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নেয় শোকে।

দুর্ঘটনার বিবরণ

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দোকানটিতে হঠাৎ করেই ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যে আগুন পুরো দোকানজুড়ে ছড়িয়ে যায়। আতঙ্কিত ক্রেতা ও কর্মীরা বের হওয়ার চেষ্টা করলেও, অনেকেই ধোঁয়ার কারণে অচেতন হয়ে পড়েন। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে তখন পর্যন্ত অনেকের প্রাণ চলে গেছে।

সোনোরা রেডক্রস জানায়, উদ্ধারকাজে তাদের ৪০ জন কর্মী ও ১০টি অ্যাম্বুলেন্স অংশ নেয়। আহতদের দ্রুত শহরের নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।

সরকারের প্রতিক্রিয়া

সোনোরা রাজ্যের গভর্নর আলফোনসো ডুরাজো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “এটি এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। আমি ইতোমধ্যেই পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি।” তিনি নিশ্চিত করেন, নিহতদের মধ্যে কয়েকজন শিশু রয়েছে। গভর্নর আরও জানান, নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হবে।

রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল গুস্তাভো সালাস জানিয়েছেন, প্রাথমিক ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা গেছে—বেশিরভাগ মানুষ বিষাক্ত ধোঁয়া শ্বাস নেওয়ার কারণে মারা গেছেন। তিনি বলেন, “আমরা আগুন লাগার উৎস খতিয়ে দেখছি। এখন পর্যন্ত এটি কোনো নাশকতা নয় বলে মনে হচ্ছে।”

মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম এক্স (পূর্বের টুইটার) প্ল্যাটফর্মে এক বার্তায় নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানান। তিনি সোনোরা রাজ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় বিশেষ দল পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট বলেন, “আমরা নিশ্চিত করব, প্রত্যেকটি পরিবার প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”

আগুনের কারণ নিয়ে তদন্ত

হার্মোসিলোর ফায়ার সার্ভিস প্রধান জানিয়েছেন, আগুনের প্রকৃত কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, এটি বৈদ্যুতিক ত্রুটিজনিত দুর্ঘটনা হতে পারে। কিছু প্রত্যক্ষদর্শী দোকানের ভেতরে হালকা বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন বলেও দাবি করেছেন। এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করছে কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে, সোনোরা পুলিশের এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে, দোকানটি কোনো সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল না। এটি জনপ্রিয় ডিসকাউন্ট চেইন ‘ওয়াল্ডো’স’-এর একটি শাখা, যেখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ কেনাকাটা করতে আসে।

শোকাহত হার্মোসিলো

অগ্নিকাণ্ডের পর পুরো হার্মোসিলো শহরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে হাজারো মানুষ নিহতদের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি জানাচ্ছেন। স্থানীয় গির্জাগুলোতে প্রার্থনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। অনেকেই বলছেন, “এই ট্র্যাজেডি শুধু একটি শহরের নয়, পুরো দেশের বেদনা।”

পরবর্তী পদক্ষেপ

দুর্ঘটনার পর থেকে স্টোরটির আশপাশের এলাকা নিরাপত্তার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দমকল বিভাগ এবং তদন্তকারী দল আগুন লাগার উৎস শনাক্ত করতে কাজ করছে। ভবনের অবকাঠামোও পরীক্ষা করা হচ্ছে, যাতে জানা যায় কোনো নিরাপত্তা ত্রুটি ছিল কি না।

গভর্নর ডুরাজো জানিয়েছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দোকানটি বন্ধ থাকবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে সরকার থাকবে।

হার্মোসিলোর এই অগ্নিকাণ্ড মেক্সিকোর সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ বাণিজ্যিক দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ‘ডে অব দ্য ডেড’ উৎসবের উচ্ছ্বাসের দিনটি তাই এখন শোকের প্রতীকে পরিণত হয়েছে—একটি শহর তার প্রিয় মানুষগুলোকে হারিয়েছে, আর দেশজুড়ে বাজছে নীরবতার ঘণ্টা।

Read Previous

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল চেয়ে আপিলের ষষ্ঠ দিনের শুনানি শুরু

Read Next

জাতীয় নির্বাচনের পরই বিশ্ব ইজতেমা: দুই পক্ষকে এক মঞ্চে আনতে সরকারের উদ্যোগ

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular