২৯/০৪/২০২৬
১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ছায়া: বাংলাদেশের পর্যটন খাতে গভীর ও বহুমুখী সংকট

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : আমেরিকা, ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলেছে, যার প্রভাব বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পে পড়ছে। এই সংঘাত, যা ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে তীব্র আকার ধারণ করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন খাতে ১১ থেকে ২৭ শতাংশ হ্রাসের পূর্বাভাস দিয়েছে। এতে ২০২৬ সালে ২৩ থেকে ৩৮ মিলিয়ন কম আন্তর্জাতিক পর্যটক আসতে পারে, যার ফলে ৩৪ থেকে ৫৬ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশ, যা মধ্যপ্রাচ্যের সাথে গভীর অর্থনৈতিক ও ভ্রমণ সংযোগযুক্ত, এই যুদ্ধের পরোক্ষ কিন্তু গুরুতর প্রভাবের শিকার হচ্ছে। ফ্লাইট বাতিল, এয়ারস্পেস বন্ধ, জ্বালানি মূল্যের তীব্র বৃদ্ধি এবং বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে দেশের পর্যটন খাতে উল্লেখযোগ্য মন্দা দেখা যাচ্ছে, যা অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় খাতকে গভীর সংকটে ফেলেছে।

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। কক্সবাজারের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী ম্যানগ্রোভ বন, সিলেটের সবুজ চা বাগান, পাহাড়ি অঞ্চল এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলো বিশ্বের পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। ২০২৪-২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ৬-৭ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ দীর্ঘদূরত্বের বাজার থেকে পর্যটক বাড়ছে, এবং এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজের মতো ক্যারিয়ারগুলো কক্সবাজার ও ঢাকায় ফ্লাইট বাড়িয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে দুবাই, দোহা, আবুধাবির মতো গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাবগুলোতে বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, যার ফলে বাংলাদেশগামী আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের অন্তত ২০-২৫ শতাংশ প্রভাবিত। ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা পর্যটকরা এখন বিকল্প গন্তব্য যেমন থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম বা মালয়েশিয়া বেছে নিচ্ছেন।

জ্বালানি মূল্যের তীব্র বৃদ্ধি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮২ ডলার ছাড়িয়েছে, এবং জেট ফুয়েলের দাম ৮০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এতে আন্তর্জাতিক এয়ার টিকিটের মূল্য ১৫-৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে পর্যটকরা মূল্য-সংবেদনশীল, এই বৃদ্ধি ভ্রমণকে অনেকের জন্য অসম্ভব করে তুলেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীরা ফ্লাইট বাতিলের কারণে আটকে পড়ছেন, এবং হোটেল বুকিংয়ে ৩০-৪০ শতাংশ হ্রাস দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে কক্সবাজার ও সিলেটে।

যুদ্ধের প্রভাব শুধু আন্তর্জাতিক পর্যটকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশীয় পর্যটনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। প্রায় ৭৫ লাখ বাংলাদেশী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমানে কাজ করেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিসিসি দেশগুলো থেকে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ শতাংশ এসেছে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে এয়ারস্পেস বন্ধ ও ফ্লাইট বাতিলের ফলে নতুন শ্রমিকদের যাওয়া ব্যাহত হচ্ছে, এবং বিদ্যমান কর্মীদের আয় কমতে পারে। রেমিট্যান্স ১০-২০ শতাংশ কমলে পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে, যা দেশীয় পর্যটন—যেমন ছুটির সময় কক্সবাজার বা সিলেট ভ্রমণ—কে কমিয়ে দেবে।

বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ শিল্পের উপর এই যুদ্ধের প্রভাব আরও বিস্তৃত। বিশ্ব পর্যটন ও ভ্রমণ কাউন্সিলের মতে, বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ শিল্প ১১.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাতও প্রভাবিত হচ্ছে, কারণ আরএমজি পণ্যের শিপিং রুট যেমন সুয়েজ খাল, স্ট্রেইট অফ হরমুজ বা বাব আল-মান্দেবে বাধা সৃষ্টি হলে খরচ বাড়বে। এতে অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে এবং পর্যটন খাতে বিনিয়োগ কমবে। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ২০-৩০ শতাংশ কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে পর্যটন খাতে ২৫-৩৫ শতাংশ হ্রাস দেখা যেতে পারে, যা হাজার হাজার চাকরি হারানোর কারণ হবে। হোটেল, রিসোর্ট, ট্যুর অপারেটর ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে ক্ষতির মুখোমুখি। সুন্দরবনের ইকো-টুরিজম সাইটগুলোতে পর্যটক কমলে স্থানীয় সম্প্রদায়ের আয় হ্রাস পাবে, যা পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্পকেও প্রভাবিত করবে।

সরকার এই সংকট মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। পর্যটন মন্ত্রণালয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন ও ভারত থেকে পর্যটক আকর্ষণের জন্য নতুন প্রচারণা চালু করেছে। ডিজিটাল মার্কেটিং, ভার্চুয়াল ট্যুর এবং অভ্যন্তরীণ পর্যটনকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বলছেন, বিকল্প রুট প্রচার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা দরকার।

সারাংশে, আমেরিকা-ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে একটি বহুমুখী সংকটের মধ্যে ফেলেছে। ফ্লাইট ডিসরাপশন, জ্বালানি সংকট, রেমিট্যান্স হ্রাস এবং বিশ্বব্যাপী ভয়ের পরিবেশ এই খাতের পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তুলেছে। যদি যুদ্ধ শীঘ্রই সমাধান না হয়, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অর্থনীতিতে গভীর ছাপ ফেলবে। সরকার, বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দ্রুত কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে এই সম্ভাবনাময় খাতকে রক্ষা করা যায়।

Read Previous

খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ২০০৬ ব্যাচের ইফতার মাহফিল: “বন্ধুত্বের বন্ধনে ২০ বছর” স্লোগানে মিলনমেলা

Read Next

কাতারের আকাশসীমা আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার: ইরানি হামলার পর যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ শুরু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular