
বিমান বাংলাদেশ
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ কয়েকটি দেশীয় বিমান সংস্থার কাছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বিপুল অঙ্কের অর্থ বকেয়া পড়ে আছে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, শুধু বিমানের কাছেই পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা, যা বেবিচকের আর্থিক স্থিতি ও চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
বেবিচকের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মোট বকেয়া হিসাব করা হয়। এতে দেখা যায়, দেশীয় পাঁচটি বিমান সংস্থার কাছে কর্তৃপক্ষের পাওনা প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় খেলাপি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, যার বকেয়া ৬ হাজার ৬৮ কোটি টাকারও বেশি।
এই অঙ্কের মধ্যে মূল বিল ৭৪৫ কোটি টাকা, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ৫২৮ কোটি টাকা, আয়কর প্রায় আধা কোটি টাকা এবং সারচার্জ প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারচার্জের এই বিপুল পরিমাণই বছরের পর বছর বিলম্বিত পরিশোধের প্রমাণ বহন করে।
বর্তমানে পরিচালিত সংস্থাগুলোর মধ্যে নভোএয়ারের বকেয়া রয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৮ কোটি ৮০ লাখ মূল বিল এবং ৩ কোটি ৬০ লাখ ভ্যাট। তবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ও এয়ার অ্যাস্ট্রা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের কোনো বকেয়া নেই।
অন্যদিকে, বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়েকটি সংস্থার ঋণও বেবিচকের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, জিএমজি এয়ারলাইন্স ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজের বকেয়া মিলিয়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকারও বেশি।
ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ২০১৬ সালে কার্যক্রম বন্ধ করার সময় ৩৯১ কোটি টাকার বেশি ঋণী ছিল। প্রতিষ্ঠানটি সরকারকে অনুরোধ করেছিল সারচার্জের ৩০০ কোটি টাকা মওকুফের বিনিময়ে মূলধনের ৫৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে, তবে অর্থ মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাব নাকচ করে।
জিএমজি এয়ারলাইন্স ২০১২ সালে বন্ধ হওয়ার আগে প্রায় ২০০ কোটি টাকার দেনায় জর্জরিত ছিল, যা এখন বেড়ে ৪১১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একইভাবে, রিজেন্ট এয়ারওয়েজের ২০২০ সালে প্রথম করোনা ঢেউয়ের সময় বকেয়া ছিল ২৮৩ কোটি টাকা; এখন তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৫৫ কোটি টাকায়।
বেবিচক জানিয়েছে, বকেয়া আদায়ের জন্য একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে যথাযথ সাড়া মেলেনি। এর ফলে বিমানবন্দর উন্নয়ন, আধুনিক সরঞ্জাম ক্রয় ও নিরাপত্তা জোরদারসহ বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “বিমানসহ কয়েকটি সংস্থার দীর্ঘমেয়াদি বকেয়া এখন আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। এই টাকার একটা বড় অংশ ফেরত না এলে নতুন অবকাঠামো বা প্রযুক্তি উন্নয়নের কাজ বিলম্বিত হতে পারে।”
বেবিচকের রাজস্বের একটি বড় অংশ আসে বিমান সংস্থাগুলোর কাছ থেকে আদায়কৃত অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ থেকে। এর মধ্যে আছে ল্যান্ডিং ফি, রুট নেভিগেশন চার্জ, বোর্ডিং ব্রিজ ব্যবহার, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, কাউন্টার ভাড়া, গাড়ি পার্কিং, এমনকি ক্যাটারিং সেবার বিলও।
তবে বছরের পর বছর পরিশোধ বিলম্ব ও সুদ-সারচার্জ বাড়তে থাকায় বেবিচকের হাতে কার্যত নগদ প্রবাহ কমে এসেছে। এতে করে বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ, রানওয়ে উন্নয়ন এবং যাত্রীসেবা মানোন্নয়নে গতি হারাচ্ছে সংস্থাটি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বকেয়া ইস্যু শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিফলন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর আর্থিক শৃঙ্খলার ঘাটতিরও স্পষ্ট ইঙ্গিত। তাদের মতে, বেবিচক যদি এই টাকাগুলো আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে দেশের বিমান খাতের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।



