বিক্রমপুরের প্রাচীন ঐতিহ্যের জীবন্ত সাক্ষী: আরিয়াল বিলের পাশে ‘বিক্রমপুর জাদুঘর’ পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ের খুব কাছে, ছনবাড়ী (শ্রীনগর পয়েন্ট) থেকে পশ্চিমে ভাগ্যকূলের দিকে গেলেই একদিকে প্রমত্তা পদ্মা নদী আর অন্যদিকে নয়নাভিরাম আরিয়াল বিলের মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে। এই বিলের ধারেই অবস্থিত ভাগ্যকূলের সাবেক জমিদার যদুনাথ রায়ের ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি। একসময় পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা এই বাড়িটিকে এখন রূপান্তরিত করা হয়েছে বিক্রমপুর জাদুঘরে। মনোমুগ্ধকর পুরনো প্রাসাদ, কাচারী ঘর, দুর্গা মন্দির, লক্ষ্মী মন্দির এবং চারপাশে দুর্লভ ফুল-ফলের গাছের সমাহার—সব মিলিয়ে এখানে এসে মনে হয় যেন ইতিহাসের এক অধ্যায়ে পা রেখেছেন।

বিক্রমপুরের ইতিহাস কমপক্ষে ১২০০ থেকে ১৫০০ বছরের পুরনো। প্রাচীন পূর্ববঙ্গ বা সমতটের রাজধানী হিসেবে এ অঞ্চলের খ্যাতি ছিল বিশ্বজুড়ে। মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে হাজার বছরের পুরনো নৌকা, কাঠ ও পাথরের ভাস্কর্য, টেরাকোটা এবং অসংখ্য প্রত্নবস্তু। এখানকার মাটিতে জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য মনীষী যাঁরা দেশ-বিদেশে খ্যাতি ছড়িয়েছেন। এই অমূল্য ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের লক্ষ্যে সামাজিক সংগঠন ‘অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন’ ২০১০ সাল থেকে কাজ শুরু করে। মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার রাড়িখাল ইউনিয়নের উত্তর বালাসুর গ্রামে জমিদার যদুনাথ রায়ের ১৯৬৫ সাল থেকে পরিত্যক্ত বাড়িতে তারা গড়ে তুলেছে ‘বিক্রমপুর জাদুঘর’। সরকারকে বছরে দুই লাখ টাকা লিজ দিয়ে এবং প্রতি মাসে এক লাখ টাকারও বেশি খরচ বহন করে ১৩ বছর ধরে জাদুঘরটি চালিয়ে যাচ্ছে ফাউন্ডেশন।

জাদুঘরের কিউরেটর নাছির উদ্দিন আহমেদ জানান, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সরকারি অর্থায়নে প্রায় সাড়ে ১৩ একর জমিতে বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এখানে শুধু জাদুঘর নয়, গেস্ট হাউস ‘পান্থশালা’, নৌ-জাদুঘর বা বোট মিউজিয়াম, শহিদ মুনীর-আজাদ স্মৃতি পাঠাগার এবং অগ্রসর বিক্রমপুর সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও গড়ে তোলা হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধু এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে মাত্র ৫০ মিনিটে পৌঁছানো যায় এই জাদুঘরে। শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু স্বস্তি পেতে চাইলে এটি আদর্শ স্থান। পরিবার নিয়ে বা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ঘুরতে, প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিতে এখানে আসেন হাজারো মানুষ।

তিনতলা বিশিষ্ট জাদুঘর ভবনের সঙ্গেই রয়েছে তিনতলা গেস্ট হাউস। মোট সাতটি গ্যালারিতে সাজানো হয়েছে বিক্রমপুরের ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শন। নিচতলার বাম পাশের গ্যালারিটি যদুনাথ রায়ের নামে। এখানে রয়েছে বিক্রমপুরের প্রাচীন মানচিত্র, বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা মাটির পাত্র, পোড়া মাটির খেলনা এবং নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ডান পাশের গ্যালারিটি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর নামে। সেখানে ব্যাসাল্ট পাথরের বাটি, গামলা, থালা, পোড়া মাটির ইট, টালি এবং বিক্রমপুরের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার ছবি স্থান পেয়েছে।

দ্বিতীয় তলায় বাম পাশের গ্যালারিতে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস—ছবি, দলিল, বই এবং বিভিন্ন নমুনা। ডান পাশে বিক্রমপুরে জন্ম নেওয়া মনীষীদের জীবন ও কর্মের বিস্তারিত বৃত্তান্ত। এখানে আরও রয়েছে কাগজ আবিষ্কারের আগের যুগের ভূর্জপত্র—ভূর্জ গাছের বাকলে লেখা প্রাচীন দলিল। তৃতীয় তলায় সাজানো হয়েছে তালপাতায় লেখা পুঁথি, পুরনো খাট-পালঙ্ক, চেয়ার, টেবিল, আলমারি, কাঠের সিন্দুক, প্রাচীন মুদ্রা, তাঁতের চরকা, পোড়া মাটির মূর্তি ও সিরামিকের থালাসহ দৈনন্দিন ব্যবহার্য অসংখ্য নিদর্শন।

এই জাদুঘরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতার উদ্ধার। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে খননকাজ চালিয়ে প্রায় দেড় হাজার বছর আগের বৌদ্ধনগরীসহ একাধিক প্রত্ননিদর্শন বেরিয়ে এসেছে। এক হাজার থেকে দেড় হাজার বছরের মধ্যে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সভ্যতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব নির্মাণশৈলী শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো মানবজাতির ইতিহাসে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জাদুঘর প্রাঙ্গণে নিয়মিত আয়োজন হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সফর, সামাজিক সংগঠন ও কর্পোরেট অনুষ্ঠান। দূর-দূরান্ত থেকে আসেন দর্শনার্থী। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যাও কম নয়। কিউরেটর নাছির উদ্দিন আহমেদ জানান, ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ, দিল্লি ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কবি-লেখক, বাচিক শিল্পীসহ অনেকেই এসেছেন। শুধুমাত্র জাদুঘর দেখার জন্য ভারত থেকে অনেকে সফর করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি সাংবাদিক দম্পতি পল কনেট ও এলেন কনেট, জাপানি সাংবাদিক মিকহিও ম্যাৎসুই, বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ট্রান্সপোর্ট বিশেষজ্ঞ নাটালিয়া এবং ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইসও পরিদর্শন করেছেন।

জাদুঘরের পেছনের ইতিহাসও কম রোমাঞ্চকর নয়। রাজা সীতানাথ রায়ের দুই ছেলে যদুনাথ ও প্রিয়নাথ রায় চল্লিশের দশকে পদ্মার ভাঙন থেকে বাঁচতে আরিয়াল বিলের কিনারে এই দ্বৈত প্রাসাদ গড়ে তুলেছিলেন। একটি যদুনাথ রায়ের, অন্যটি প্রিয়নাথ রায়ের। বিশাল দিঘি, নাট মন্দির, দুর্গা মন্দির, সোয়ারেজ লাইন, নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা—সবকিছু ছিল এই বাড়িতে। ড. হুমায়ুন আজাদ তার ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’ গ্রন্থে এই বাড়িকে ‘বিলের ধারে প্যারিস শহর’ বলে অভিহিত করেছেন।

বৃহস্পতিবার ছাড়া সপ্তাহের ছয় দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় জাদুঘর। প্রবেশমূল্য নামমাত্র। এই জাদুঘর শুধু একটি প্রদর্শনী কেন্দ্র নয়, বরং বিক্রমপুরের হাজার বছরের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলার এক অনন্য প্রয়াস। যারা ঢাকার কাছেই একটু প্রকৃতি ও ইতিহাসের মাঝে সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য বিক্রমপুর জাদুঘর আজ এক অপূর্ব গন্তব্য। এখানে এসে শুধু অতীত দেখা যায় না, ভবিষ্যতের প্রেরণাও খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ 

Read Previous

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জেরে জেট ফুয়েলের দাম আকাশছোঁয়া, থাই এয়ারওয়েজকে টিকিটের দাম ১০-১৫% বাড়াতে হলো

Read Next

ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে আজ থেকে দেশজুড়ে অফিস-আদালত ও ব্যাংকে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড শুরু

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular