২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বৃদ্ধিতে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের ভূমিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বাংলাদেশের পর্যটন খাত ধীরে হলেও স্থির গতিতে এগোচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন, নদীমাতৃক জীবনধারা, পাহাড়–সমুদ্র–বন—সব মিলিয়ে দেশের ভেতরেই রয়েছে বহুমুখী পর্যটন সম্ভাবনা। কিন্তু শুধু দর্শনীয় স্থান থাকলেই পর্যটন বিকশিত হয় না। পর্যটককে আকর্ষণ করা, ধরে রাখা এবং বারবার ফেরার মতো অভিজ্ঞতা দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর একটি হলো হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট। বাস্তবতা হলো, এই খাতটি এখন বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের মেরুদণ্ডে পরিণত হয়েছে।

প্রথমেই আসে আবাসনের প্রশ্ন। একজন পর্যটক কোথাও যেতে চাইলে সবচেয়ে আগে জানতে চায়—সেখানে থাকা যাবে তো? নিরাপদ, পরিষ্কার ও আরামদায়ক আবাসন না থাকলে পর্যটন সম্ভাবনা অনেকটাই মুখ থুবড়ে পড়ে। কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, সিলেট, কুয়াকাটা কিংবা সুন্দরবনের মতো এলাকাগুলোতে গত এক দশকে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা বাড়ার ফলে দেশীয় পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহও বেড়েছে। পাঁচ তারকা হোটেল থেকে শুরু করে বাজেট হোটেল, ইকো রিসোর্ট কিংবা হোমস্টে—বিভিন্ন স্তরের আবাসন ব্যবস্থা তৈরি হওয়ায় ভ্রমণ এখন অনেক বেশি সহজলভ্য হয়েছে।

হোটেল ও রিসোর্টগুলো শুধু থাকার জায়গা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অভিজ্ঞতা তৈরি করছে। আধুনিক রিসোর্টগুলোতে সুইমিং পুল, স্পা, কনফারেন্স হল, লোকাল খাবার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং অ্যাডভেঞ্চার অ্যাক্টিভিটি যুক্ত হওয়ায় পর্যটকরা একই জায়গায় একাধিক অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন। এতে পর্যটকদের অবস্থানের সময় বাড়ছে, ব্যয়ও বাড়ছে, যা সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। কক্সবাজার বা সাজেকের রিসোর্টগুলো তার বাস্তব উদাহরণ।

দেশীয় পর্যটনের বিকাশেও এই খাত বড় ভূমিকা রাখছে। একসময় ভ্রমণ মানেই ছিল সীমিত সংখ্যক মানুষের বিষয়। এখন মধ্যবিত্ত পরিবারও ছুটি পেলেই দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় যাচ্ছে। এর পেছনে বড় কারণ হলো তুলনামূলক সাশ্রয়ী হোটেল ও মোটেলের বিস্তার। সরকারি পর্যটন মোটেল থেকে শুরু করে বেসরকারি বাজেট হোটেল—সব মিলিয়ে বিভিন্ন আয়ের মানুষের জন্য ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ পর্যটনের বাজার বড় হচ্ছে, যা পর্যটন খাতকে আরও টেকসই করছে।

বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের ক্ষেত্রেও মানসম্মত হোটেল ও রিসোর্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক পর্যটকরা নিরাপত্তা, পরিষেবা মান, স্বাস্থ্যবিধি এবং আন্তর্জাতিক মানের সুবিধার দিকে বেশি গুরুত্ব দেন। ঢাকায়, চট্টগ্রামে ও কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল চেইন আসায় বাংলাদেশকে এখন অনেকটাই ভরসাযোগ্য গন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যবসায়িক ভ্রমণ, কনফারেন্স ট্যুরিজম ও ডিপ্লোম্যাটিক ভিজিট বাড়ার পেছনেও এই অবকাঠামো বড় ভূমিকা রাখছে।

হোটেল ও রিসোর্ট শিল্প সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে—এটা আর নতুন কথা নয়। তবে বিষয়টা শুধু রিসেপশন বা হাউসকিপিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শেফ, সার্ভিস স্টাফ, নিরাপত্তা কর্মী, ড্রাইভার, ইভেন্ট ম্যানেজার, ট্যুর গাইড—বিভিন্ন পেশার মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষক, জেলে, হস্তশিল্পী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হচ্ছেন, কারণ হোটেলগুলো খাবার, পণ্য ও সেবার জন্য স্থানীয় উৎসের ওপর নির্ভর করছে। এর ফলে পর্যটন এলাকাভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অবকাঠামো উন্নয়ন। যেখানে বড় হোটেল বা রিসোর্ট গড়ে ওঠে, সেখানে রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নও ত্বরান্বিত হয়। সরকার ও বেসরকারি খাত যৌথভাবে এসব এলাকায় বিনিয়োগ বাড়ায়। এর সুফল শুধু পর্যটক নয়, স্থানীয় বাসিন্দারাও পাচ্ছেন। অনেক প্রত্যন্ত এলাকা হোটেল–রিসোর্ট কেন্দ্রিক উন্নয়নের মাধ্যমে মূল অর্থনৈতিক ধারার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

পর্যটন ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রেও এই খাতের ভূমিকা কম নয়। আধুনিক রিসোর্ট ও হোটেলগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক ট্রাভেল প্ল্যাটফর্ম এবং রিভিউ সাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটন গন্তব্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরছে। একটি ভালো রিসোর্টের ছবি বা অভিজ্ঞতা অনেক সময় পুরো গন্তব্যের পরিচিতি তৈরি করে দেয়। এতে বাংলাদেশের সফট ইমেজ শক্তিশালী হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অপরিকল্পিত হোটেল নির্মাণ, পরিবেশ দূষণ, স্থানীয় সংস্কৃতির অবহেলা এবং মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি কিছু এলাকায় সমস্যা তৈরি করছে। টেকসই পর্যটনের জন্য প্রয়োজন পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং প্রশিক্ষিত জনবল। ইতিবাচক দিক হলো, অনেক নতুন রিসোর্ট এখন ইকো-ট্যুরিজম ও সাসটেইনেবল মডেলের দিকে ঝুঁকছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক।

সব মিলিয়ে বলা যায়, হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট খাত এখন বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই খাত যত পরিকল্পিত, মানসম্মত ও টেকসইভাবে এগোবে, বাংলাদেশের পর্যটন তত বেশি বৈচিত্র্যময় ও প্রতিযোগিতামূলক হবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে আধুনিক আতিথেয়তার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বাংলাদেশ আঞ্চলিক পর্যটন মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

তৃতীয়বারের পথে ফং না–কে বাং: নান্দনিক মূল্যকে সামনে রেখে নতুন করে ইউনেস্কো মনোনয়নের প্রস্তুতি

Read Next

জাতীয় নির্বাচন ও পাহাড়ি অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য যুক্তরাজ্যের ভ্রমণ সতর্কতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular