
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব বড়দিন উপলক্ষে আজ থেকে শুরু হওয়া টানা তিন দিনের ছুটিতে দেশের প্রায় সব পর্যটন কেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। আজ সকাল থেকেই পর্যটকদের আগমনে শহরের প্রবেশপথ, হোটেল এলাকা, সমুদ্রসৈকত ও বিপণিবিতানগুলোতে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড়দিনের ছুটি ঘিরে কক্সবাজারের প্রায় সব হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউস আগেই শতভাগ বুকিং হয়ে গেছে।
আজ সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে পর্যটকদের বহনকারী বাস, মাইক্রোবাস ও প্রাইভেটকারে কক্সবাজার শহরে প্রবেশ করছে। কলাতলী, লাবণী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট, ইনানী ও হিমছড়ি এলাকায় পর্যটকদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। পরিবার নিয়ে ভ্রমণে আসা পর্যটকদের পাশাপাশি বন্ধুদের দল ও তরুণ-তরুণীর উপস্থিতিও ছিল বেশি। সমুদ্রসৈকতে ছবি তোলা, ঘোড়ায় চড়া, বিচ বাইক ও জেটস্কি চালানোসহ নানা বিনোদনে মেতে উঠেছেন তারা।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির এক শীর্ষ ব্যবসায়ী আজ দুপুরে বলেন, “বড়দিনের ছুটি সামনে রেখে এক সপ্তাহ আগেই প্রায় সব হোটেল বুকিং হয়ে যায়। আজ কার্যত আমাদের কোনো খালি কক্ষ নেই। অনেক পর্যটক শেষ মুহূর্তে এসে রুম না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন বা শহরের বাইরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর এমন ব্যস্ততা আমাদের জন্য খুবই আনন্দের।” তিনি আরও জানান, এই কয়েক দিনে হোটেল খাতের সঙ্গে জড়িত হাজারো কর্মচারী অতিরিক্ত কাজের সুযোগ পেয়েছেন, যা তাদের আয়ের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শুধু হোটেল-মোটেল নয়, বড়দিনের এই ছুটিতে কক্সবাজারের রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, পর্যটন স্পট ও পরিবহন খাতেও ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেছে। সমুদ্রের পাড়ে অবস্থিত রেস্তোরাঁগুলোতে দুপুর ও রাতে বসার জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। পর্যটকদের চাপ সামাল দিতে অনেক প্রতিষ্ঠান বাড়তি কর্মী নিয়োগ করেছে।
পর্যটকদের ভিড় ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গেলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আজ বলেন, “বড়দিন উপলক্ষে কক্সবাজারে পর্যটকদের যে ঢল নেমেছে, তা আমাদের জন্য আনন্দের পাশাপাশি একটি বড় দায়িত্বও। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়তি নজরদারি রাখা হয়েছে। যানজট নিয়ন্ত্রণ, সৈকতের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।” তিনি পর্যটকদের নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সবার সহযোগিতায় একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভ্রমণ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
আজ কক্সবাজারে আসা পর্যটকদের মধ্যেও ছিল সন্তুষ্টির অনুভূতি। ঢাকার উত্তরা থেকে পরিবার নিয়ে ভ্রমণে আসা এক নারী পর্যটক বলেন, “আজ সকালে আমরা কক্সবাজারে পৌঁছেছি। ভিড় অনেক বেশি, কিন্তু সেটাই স্বাভাবিক। সমুদ্রের সৌন্দর্য আর পরিবেশ আমাদের মুগ্ধ করেছে।প্রশাসনের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো, যা আমাদের নিরাপত্তার অনুভূতি দিচ্ছে। বড়দিনের ছুটি এমন জায়গায় কাটাতে পেরে আমরা খুব খুশি।”
বড়দিনের ছুটিতে কক্সবাজারের ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোও নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ঝিনুক মার্কেট, বার্মিজ মার্কেট ও শুটকি মার্কেটে আজ সকাল থেকেই পর্যটকদের ভিড় ছিল অবিরাম। স্মারক ও উপহার কেনার জন্য এসব বাজারে ভিড় করছেন নারী-পুরুষ সবাই।
ঝিনুক মার্কেটের এক ব্যবসায়ী আজ বিকেলে বলেন, “আজ সকাল থেকেই বিক্রি ভালো। ঝিনুক দিয়ে তৈরি গয়না, শোপিস আর ঘর সাজানোর জিনিস পর্যটকদের খুব পছন্দ হচ্ছে। বিশেষ করে নারী পর্যটকরা এসব পণ্য কিনছেন বেশি। বড়দিনের এই ছুটিতে বিক্রি কয়েক গুণ বেড়েছে, যা আমাদের জন্য বড় স্বস্তি।”
বার্মিজ মার্কেটের এক বিক্রেতা জানান, “আজ সারাদিন বসে থাকার সুযোগ পাইনি। পর্যটকরা বার্মিজ কাপড়, হ্যান্ডিক্রাফট আর ছোটখাটো উপহার সামগ্রী কিনছেন। দরদাম হলেও শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগই কেনাকাটা করছেন। বড়দিনের ছুটিতে এমন ভিড় আমাদের ব্যবসাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করছে।”
একই চিত্র দেখা গেছে শুটকি মার্কেটে। শুটকি ব্যবসায়ী বলেন, “কক্সবাজারের শুটকির আলাদা সুনাম আছে। বড়দিনের ছুটিতে অনেক পর্যটক শুটকি কিনছেন উপহার হিসেবে বা নিজেদের জন্য। আজ একদিনেই ভালো বিক্রি হয়েছে। এই তিন দিন ভালো গেলে আমাদের পুরো মাসের হিসাব অনেকটা ঠিক হয়ে যায়।”
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বড়দিনের মতো ধর্মীয় উৎসবের ছুটি এখন দেশের মানুষের জন্য ভ্রমণের বড় উপলক্ষ হয়ে উঠছে। কর্মব্যস্ত জীবনের ফাঁকে পরিবার ও প্রিয়জনদের নিয়ে সমুদ্রের ধারে সময় কাটানোর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। তবে তারা বলছেন, ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সব মিলিয়ে আজকের বড়দিনের ছুটির প্রথম দিনেই কক্সবাজারে যে চিত্র দেখা গেছে, তা দেশের পর্যটন শিল্পের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। হোটেল-মোটেল মালিক থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক—সবাই এই ভিড়ের সুফল পাচ্ছেন। পর্যটকরাও পাচ্ছেন আনন্দঘন ছুটির অভিজ্ঞতা। সংশ্লিষ্টদের আশা, বড়দিনের এই তিন দিনের ছুটি কক্সবাজারের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং ভবিষ্যতে দেশের পর্যটন খাত আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।



