
নিজস্ব প্রতিবেদক, পর্যটন সংবাদ | ফেনী: টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফেনীর জনজীবন। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলার অন্তত ৩৫টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে। ইতিমধ্যে নদীর তীরবর্তী ১৫টি স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পড়েছে, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে বহু এলাকা।
জানা গেছে, সোমবার সকাল ৯টা থেকে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় ফেনীতে রেকর্ড হয়েছে ৫৩৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। এরই মধ্যে মুহুরী নদীর পানির স্তর বিপদসীমা (১২.৫৫ মিটার) ছাড়িয়ে পৌঁছেছে ১৩.৯২ মিটারে। শুধুমাত্র ১৫ ঘণ্টায় পানি বেড়েছে প্রায় ৬.৯২ মিটার (২২ ফুট ১০ ইঞ্চি), যা গত এক দশকের মধ্যে নজিরবিহীন।
ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলায় নদী বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়েছে। পরশুরামে অন্তত ১০টি ও ফুলগাজীতে ৫টি স্থানে বাঁধ ভেঙেছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় প্রশাসন। ফলে কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
পরশুরামের চিথলিয়া এলাকার জাকিয়া আক্তার জানান, রাত ৮টার দিকে হঠাৎ ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। তিনি পরিবারসহ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হন। মির্জানগরের রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পাউবোর অবহেলার কারণেই সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বল্লামুখা বাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।”

বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, স্কুলে পরীক্ষাও বন্ধ
প্লাবিত এলাকায় বৈদ্যুতিক মিটার ও সাব-স্টেশন পানির নিচে চলে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রেখেছে ফেনী বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগ ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বহাল থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
ফুলগাজী উপজেলায় সকল উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দুর্গতদের পাশে প্রশাসন
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ১৩১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১৫০ জন মানুষ। দুর্গতদের সহায়তায় ১২০ মেট্রিক টন চাল, ৬.৫ লাখ টাকার নগদ খাদ্য সহায়তা, ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৪০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনটি উপজেলায় ফুলগাজীতে ৯৯টি, পরশুরামে ৩২টি ও ফেনী সদরে ২২টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন ২ হাজার ৫৪৭ জন দক্ষ স্বেচ্ছাসেবক।

আশঙ্কা আরও বৃষ্টির
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আখতার হোসেন জানান, ভারতের ত্রিপুরায় বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এর ফলে নতুন করে বাঁধ ভাঙনের ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে। একইসঙ্গে আবহাওয়া অফিসও জানিয়েছে, বুধবার ও বৃহস্পতিবার ফেনীতে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, যেখান থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।



