২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে আকাশপথে ভ্রমণ: বাড়তে থাকা ঝুঁকি, কড়া নিয়ম এবং যাত্রীদের জানা জরুরি সবকিছু

বিমানে পাওয়ার ব্যাংক ব্যবহার

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ছুটির মৌসুম এলেই আকাশপথে যাত্রীর চাপ বাড়ে। সঙ্গে বাড়ে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, ক্যামেরা আর পাওয়ার ব্যাংকের সংখ্যা। আধুনিক ভ্রমণে এগুলো প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই প্রয়োজনীয় ডিভাইসগুলোর ভেতরে থাকা লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এখন বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি এতটাই গুরুত্ব পাচ্ছে যে বিশ্বজুড়ে বিমান সংস্থা ও বিমান নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নতুন করে সতর্কতা জারি করছে এবং নিয়ম আরও কঠোর করছে।

বিমানের কেবিন বা কার্গো হোল্ডে আগুন লাগার ঝুঁকি নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাওয়ার ব্যাংক ও ব্যাটারিচালিত ডিভাইসের সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, তাতে ঝুঁকিও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা মূলত ব্যাটারি নয়, সমস্যা ভুল প্যাকিং, অসচেতনতা এবং নিয়ম না মানার প্রবণতা।

লিথিয়াম ব্যাটারি কেন ঝুঁকিপূর্ণ

লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সাধারণ অবস্থায় নিরাপদ। প্রতিদিন আমরা স্মার্টফোনে, ল্যাপটপে কিংবা ক্যামেরায় এগুলো ব্যবহার করছি। কিন্তু ব্যাটারি যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে আসে অথবা শর্ট সার্কিট হয়, তাহলে মুহূর্তেই আগুন ধরে যেতে পারে। এই আগুন পানি দিয়ে সহজে নেভানো যায় না এবং একবার শুরু হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিমানের কার্গো হোল্ডে এই ধরনের আগুন সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ সেখানে ক্রুদের সরাসরি হস্তক্ষেপ করার সুযোগ থাকে না। বিপরীতে কেবিনে যদি কোনো ডিভাইস অতিরিক্ত গরম হয় বা ধোঁয়া বের হয়, কেবিন ক্রুরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে পারেন। এই কারণেই লিথিয়াম ব্যাটারিযুক্ত সব ডিভাইস কেবিনে রাখার ওপর এত জোর দেওয়া হচ্ছে।

সচেতনতা আছে, আচরণে ঘাটতি

ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (IATA) সম্প্রতি যাত্রীদের আচরণ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেছে। এতে একটি অস্বস্তিকর চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৯৩ শতাংশ যাত্রী বলেছেন, তারা লিথিয়াম ব্যাটারি সংক্রান্ত নিয়ম সম্পর্কে জানেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রায় অর্ধেক যাত্রী এখনো নিয়ম ভেঙে ব্যাটারিচালিত ডিভাইস চেক করা লাগেজে রেখে দিচ্ছেন।

এই ব্যবধানটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। মানুষ জানে, কিন্তু গুরুত্ব দেয় না। অনেকেই ভাবেন, ছোট পাওয়ার ব্যাংক বা পুরোনো ফোনে তেমন ঝুঁকি নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধারণাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

যাত্রীরা এখন কী কী বহন করছেন

IATA-এর আরেকটি জরিপ বলছে, বর্তমান সময়ে যাত্রীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ব্যাটারিচালিত ডিভাইস নিয়ে ভ্রমণ করছেন। প্রায় ৮৩ শতাংশ যাত্রী সঙ্গে রাখছেন স্মার্টফোন। ৬০ শতাংশ ল্যাপটপ নিয়ে উঠছেন বিমানে। ৪৪ শতাংশ যাত্রীর ব্যাগে থাকছে পাওয়ার ব্যাংক। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে ক্যামেরা, স্মার্টওয়াচ, ইয়ারবাড, ড্রোনের ব্যাটারি এবং ই-সিগারেট।
ডিভাইস যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে ঝুঁকি। ফলে বিষয়টি আর আনুষ্ঠানিক নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন সরাসরি ফ্লাইট সেফটির প্রশ্ন।

বিমান সংস্থাগুলোর সাতটি মূল নির্দেশনা

এই ঝুঁকি কমাতে IATA এবং বিভিন্ন বিমান সংস্থা যাত্রীদের জন্য সাতটি মৌলিক নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রথমত, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডিভাইস বা ব্যাটারি সঙ্গে না নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। যত বেশি ব্যাটারি, ঝুঁকিও তত বেশি।
দ্বিতীয়ত, যাত্রাপথে কোনো ডিভাইস যদি অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়, ফুলে ওঠে বা ধোঁয়া বের হয়, তাহলে তা লুকানোর চেষ্টা না করে সঙ্গে সঙ্গে কেবিন ক্রুকে জানাতে হবে।

তৃতীয়ত, নিজের ব্যাটারির ক্ষমতা সম্পর্কে জানা জরুরি। সাধারণত ১০০ ওয়াট-ঘন্টার বেশি ক্ষমতার ব্যাটারির জন্য আলাদা অনুমোদন লাগে। অনেক যাত্রীই জানেন না, তাদের পাওয়ার ব্যাংক বা ক্যামেরার ব্যাটারি এই সীমার মধ্যে পড়ে কিনা।

চতুর্থত, ফোন, ল্যাপটপ, পাওয়ার ব্যাংক, ক্যামেরা এবং অনুমোদিত ভ্যাপ ডিভাইস অবশ্যই হ্যান্ড লাগেজে রাখতে হবে। চেক করা লাগেজে এগুলো রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

পঞ্চমত, যদি কোনো ক্যারি-অন ব্যাগ গেট-চেক করে হোল্ডে পাঠানো হয়, তাহলে তার ভেতর থেকে সব লিথিয়াম ব্যাটারি ও ডিভাইস বের করে নিতে হবে।

ষষ্ঠত, অতিরিক্ত বা আলাদা ব্যাটারি নিরাপদভাবে প্যাক করতে হবে। মূল প্যাকেট না থাকলে টার্মিনাল টেপ দিয়ে ঢেকে শর্ট সার্কিটের ঝুঁকি কমাতে হবে।

সপ্তমত, প্রতিটি বিমান সংস্থার নিজস্ব নিয়ম থাকতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ে নেওয়া জরুরি।
পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে কড়া হচ্ছে নিয়ম

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার পর অনেক বিমান সংস্থা পাওয়ার ব্যাংক সংক্রান্ত নিয়ম আরও কঠোর করেছে। উদাহরণ হিসেবে এমিরেটস ও ফ্লাইদুবাইয়ের কথা বলা যায়। এই সংস্থাগুলো প্রতি যাত্রীর জন্য মাত্র একটি পাওয়ার ব্যাংকের অনুমতি দিচ্ছে, যার ক্ষমতা ১০০ ওয়াট-ঘন্টার কম হতে হবে।

এছাড়া এসব পাওয়ার ব্যাংক বিমানের ভেতরে চার্জ করা যাবে না, ওভারহেড বিনে রাখা যাবে না এবং সিটের নিচে রাখতে হবে। চেক করা লাগেজে পাওয়ার ব্যাংক নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

যেসব ঘটনা সবাইকে নাড়া দিয়েছে

এই কঠোরতার পেছনে রয়েছে একাধিক ভয়াবহ ঘটনা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সিডনি থেকে হোবার্টগামী ভার্জিন অস্ট্রেলিয়ার একটি ফ্লাইটে ওভারহেড লকারে আগুন লাগে। ধারণা করা হয়, একটি পাওয়ার ব্যাংক থেকেই আগুনের সূত্রপাত। দ্রুত কেবিন ক্রুদের পদক্ষেপে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হলেও ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

এর কয়েক মাস আগেই দক্ষিণ কোরিয়ার গিমহে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড্ডয়নের প্রস্তুতিকালে একটি এয়ারবাস A321 বিমানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। পুরো বিমানটি পুড়ে যায়। তদন্তে উঠে আসে, ওভারহেড কম্পার্টমেন্টে রাখা একটি পাওয়ার ব্যাংক থেকেই আগুন ছড়িয়েছিল বলে ধারণা।

২০২৫ সালের মে মাসে চীনের হ্যাংজু থেকে শেনজেনগামী একটি ফ্লাইট উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়। ক্যারি-অন ব্যাগে থাকা পাওয়ার ব্যাংক ও ক্যামেরার ব্যাটারি থেকে ধোঁয়া বের হতে শুরু করেছিল।
এই ঘটনাগুলো বিমান সংস্থাগুলোর জন্য ছিল এক ধরনের সতর্কবার্তা।
ভুল ধারণা এখনো কাটেনি

বারবার সতর্কতার পরও অনেক যাত্রী এখনো মনে করেন, ছোট লিথিয়াম ডিভাইস চেক করা লাগেজে রাখা যায়। কেউ কেউ ভাবেন, কার্গো হোল্ডে রাখলে ঝুঁকি কম। বাস্তবতা ঠিক উল্টো।

IATA স্পষ্ট করে বলছে, লিথিয়াম ব্যাটারিযুক্ত ডিভাইসের জন্য কেবিনই সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। কারণ সমস্যা হলে ক্রুরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারেন।
ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, ক্যামেরা, পাওয়ার ব্যাংক, স্মার্টওয়াচ এবং ই-সিগারেট—সবকিছুই কেবিনে রাখতে হবে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী ১০০ ওয়াট-ঘন্টা পর্যন্ত ব্যাটারি অনুমোদিত। ১০০ থেকে ১৬০ ওয়াট-ঘন্টার জন্য বিশেষ অনুমতি লাগে। এর বেশি হলে সাধারণত নিষিদ্ধ।

স্মার্ট লাগেজের ক্ষেত্রেও সতর্কতা

স্মার্ট লাগেজ বা বিল্ট-ইন ব্যাটারিযুক্ত স্যুটকেসও এখন নজরদারির আওতায়। যেসব ব্যাগের ব্যাটারি খুলে নেওয়া যায়, সেগুলো কেবল তখনই অনুমোদিত যখন ব্যাটারি খুলে কেবিনে নেওয়া হয়। ব্যাটারি খুলে নেওয়া সম্ভব না হলে অনেক বিমান সংস্থা সেই লাগেজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করছে।

কেন এই বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ

লিথিয়াম ব্যাটারির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এগুলো সতর্কতা ছাড়াই অতিরিক্ত গরম হতে পারে। আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়ায়। কার্গো হোল্ডে হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কেবিনে হলে সুযোগ থাকে।

এই একটি পার্থক্যই বিমান সংস্থাগুলোর সব নিয়মের মূল ভিত্তি।
বিশেষজ্ঞরা যাত্রীদের পরামর্শ দিচ্ছেন, কোনো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধোঁয়া ওঠা ব্যাটারি নিজের হাতে সামলানোর চেষ্টা না করতে। কেবিন ক্রুদের প্রশিক্ষণ রয়েছে এমন পরিস্থিতি মোকাবেলার। তবে প্রতিরোধ শুরু হয় যাত্রীর ঘর থেকেই—ব্যাগ গোছানোর সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে।

ভ্রমণ যত আধুনিক হচ্ছে, দায়িত্বও তত বাড়ছে। পাওয়ার ব্যাংক ছোট একটি ডিভাইস হতে পারে, কিন্তু ভুলভাবে বহন করলে সেটিই বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। আকাশপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যাত্রী, বিমান সংস্থা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা—সবারই সচেতন থাকা এখন সময়ের দাবি।

Read Previous

ময়মনসিংহ মিউজিয়াম: ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত পাঠশালা

Read Next

গুয়াংজু বিমানবন্দরে বিমানের ফ্লাইট টার্মিনাল পরিবর্তন, ২২ জানুয়ারি থেকে টার্মিনাল-৩ এ পরিচালনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular