নরসিংদীর পলাশে লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি: ‘জামিনা মহল’-এ রূপান্তর, দেবোত্তর দাবি ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় অবস্থিত লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়িটি বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা। স্থানীয়ভাবে ‘উকিলের বাড়ি’ নামে অধিক পরিচিত এই বাড়িটি বর্তমানে ‘জামিনা মহল’ নামে চিহ্নিত। প্রতিষ্ঠাতা জমিদার লক্ষণ সাহা কর্তৃক নির্মিত এই দ্বিতল ভবনটি নব্য ধ্রুপদী বা নিওক্ল্যাসিক্যাল স্থাপত্যশৈলীর এক উজ্জ্বল উদাহরণ। শত বছরেরও অধিক পুরোনো এই স্থাপত্যটি কেবল স্থাপত্যগত মূল্যই বহন করে না, বরং ব্রিটিশ আমলের জমিদারি প্রথা, দেশভাগের প্রভাব এবং স্বাধীনতা-উত্তর সম্পত্তি হস্তান্তরের ইতিহাসকেও ধারণ করে।

নিওক্ল্যাসিক্যাল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য এই বাড়িতে স্পষ্ট। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রচলিত এই শৈলী প্রাচীন গ্রিস ও রোমের স্থাপত্য থেকে অনুপ্রাণিত। ডোরিক, আয়নিক ও করিন্থিয়ান স্তম্ভের ব্যবহার, সরু অলঙ্কৃত রেলিংযুক্ত ঝুল বারান্দা বা জুলিয়েট ব্যালকনি—যা ফ্রেঞ্চ জানালার বাইরে স্থাপিত—এই বাড়ির সামনের অংশে দৃশ্যমান। এই বারান্দাগুলো ভূমধ্যসাগরীয় শৈলীর (ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি) প্রতিফলন এবং ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষে জনপ্রিয় হয়।ভিয়েনা, প্যারিসসহ ইউরোপীয় শহরের স্থাপত্যের সঙ্গে তুলনা করা হয় এই বারান্দাগুলোকে, যদিও সংরক্ষণের অভাবে এখানকার অবস্থা ভিন্ন। মূল ভবনের উপরে ‘জামিনা মহল’ লেখা স্পষ্ট। পাশেই রয়েছে কারুকার্যখচিত একটি ছোট মন্দির, অর্ধনির্মিত প্রাচীন বাড়ির অংশ, পেছনে গাছের বাগান এবং চারদিকে উঁচু প্রাচীর। বাড়ির পেছনে সেই আমলের সুন্দর পুকুর ও সান বাঁধানো ঘাট এখনো দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিছু সূত্রে বলা হয় ২৪ কক্ষবিশিষ্ট এই ভবনটি, তবে নিশ্চিত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। নিচতলায় দুটি পরিবার বসবাস করছে, উপরতলা খালি। দোতলার একটি কক্ষে দেয়াল আলমারির ভেতরে লোহার ভাঙা একটি গোপন সিন্দুক দেখা যায়, যা অতীতের সম্পদের ইঙ্গিত দেয়। ছাদে স্থানীয় কিশোররা খেলাধুলা করে।

লক্ষণ সাহা এই জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি প্রধান জমিদারের অধীনে সাব-জমিদার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর তিন পুত্র—নিকুঞ্জ সাহা, প্যারিমোহন সাহা ও বংকু সাহা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বংকু সাহা ভারতে চলে যান। স্বাধীনতার কিছু আগে নিকুঞ্জ সাহাও ভারতে পাড়ি জমান। কেবল প্যারিমোহন সাহা এদেশে থেকে যান। তাঁর পুত্র নারায়ণ সাহা (কেউ কেউ বৌদ্ধ নারায়ণ সাহা বলে উল্লেখ করেন) স্বাধীনতার পর পুরো সম্পত্তি আহম্মদ আলী নামের এক উকিলের কাছে বিক্রি করে নারায়ণগঞ্জ জেলায় চলে যান। আহম্মদ আলী স্ত্রী জামিনার নামানুসারে বাড়িটির নাম ‘জামিনা মহল’ রাখেন। তাঁর পেশা উকিল হওয়ায় স্থানীয়রা এটিকে ‘উকিলের বাড়ি’ বলে ডাকেন। ফলে ‘ডাঙ্গা জমিদার বাড়ি’ বা ‘লক্ষণ সাহার বাড়ি’ নামে খুঁজতে গেলে অনেকে চিনতে পারেন না। বর্তমানে আহম্মদ আলী নারায়ণগঞ্জে বসবাস করেন।

এই এলাকাটি তৎকালীন ভারতবর্ষে ‘দেবোত্তর’ সম্পত্তি হিসেবে পরিচিত ছিল। দেবোত্তর বলতে বোঝায় মন্দির বা দেবতার নামে উৎসর্গকৃত জমি, যা ওয়াকফ জমির মতোই করমুক্ত। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, এই জমিতে জমিদারকে খাজনা দিতে হতো না। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিযোগ, লক্ষণ সাহার রেখে যাওয়া এই বিশাল সম্পত্তি দেবোত্তর হিসেবেই ছিল। বৌদ্ধ নারায়ণ সাহা কর্তৃক বিক্রির পর এ নিয়ে আদালতে মামলা চলছে বলে জানা গেছে। এই দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে সম্পত্তি হস্তান্তরের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বাংলাদেশে জমিদারি প্রথা ব্রিটিশ আমলের স্থায়ী বন্দোবস্তের ফল। জমিদাররা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠলেও অনেকে ইউরোপীয় স্থাপত্য অনুকরণ করে বাড়ি নির্মাণ করেন। লক্ষণ সাহার বাড়িটি তারই প্রমাণ। ইট, সুরকি ও রডের ব্যবহার, কষ্টি পাথরের মেঝে, নিপুণ কারুকাজ—সবকিছুতে সেই সময়ের বনেদি সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট। পুকুরের চারপাশে একসময় চারটি মঠ বা মন্দির ছিল, যার মধ্যে বেশিরভাগ এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত। একটি মাত্র অবশিষ্ট রয়েছে।
বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক। মালিক নারায়ণগঞ্জে থাকায় দেখভালের অভাবে স্থাপত্যটি অযত্নে পড়ে আছে। উপরতলার ঘরগুলো খালি, নিচতলায় সীমিত বসবাস। ছাদ ও বাগান স্থানীয়দের অবাধ ব্যবহারে রয়েছে। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায় ও প্রবীণরা এটিকে ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। ডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় প্রতিনিধিরা বলছেন, উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এটিকে পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা সম্ভব। সংস্কার করে ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশে এ ধরনের জমিদার বাড়ির সংখ্যা কমে আসছে।

অনেক স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে অবহেলায়। লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি তার ব্যতিক্রমী স্থাপত্য ও ইতিহাসের কারণে জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হতে পারে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। দেবোত্তর দাবি নিষ্পত্তি করে আইনি জটিলতা দূর করা গেলে সংরক্ষণ সহজ হবে।

এই বাড়িটি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়, বরং বাংলার সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী। দেশভাগ, স্বাধীনতা, সম্পত্তি হস্তান্তর এবং ধর্মীয় সম্পত্তির প্রশ্ন—সবকিছুর সঙ্গে জড়িত। স্থানীয়রা আশা করছেন, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এটি সংরক্ষিত হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ঐতিহ্য দেখতে পাবে। জামিনা মহলের কারুকাজ, বারান্দা ও পুকুরঘাট আজও বলে দেয়—একসময় এখানে বনেদি জীবনযাপনের ছবি ছিল। এখন সময় এসেছে সেই ছবিকে রক্ষা করার।

প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার

Read Previous

আসন্ন ঈদুল ফিতরে আকাশপথে যাত্রীদের চাপ: টিকিটের দাম বাড়ার আশঙ্কা তীব্র, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে প্রভাব

Read Next

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের নতুন কমিটি গঠন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular