
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : দুবাই এয়ারশো ২০২৫ এবারও প্রমাণ করে দিল, মধ্যপ্রাচ্য শুধু ভোক্তা নয়—বিশ্ব বিমানশিল্পের গতি ও মানচিত্র বদলে দিতে পারে এমন এক শক্তিশালী চালিকাশক্তি। তৃতীয় দিনের শেষে যে ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠল, তা হলো আঞ্চলিক বিমান সংস্থাগুলোর বিনিয়োগ, বহর সম্প্রসারণ এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের আগ্রাসী ধারা; আর পাশাপাশি বৈশ্বিক নির্মাতাদের সামনে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা ও উৎপাদনচাপের বাস্তবতা।
এমিরেটসের বড় দাও: আরও A350, আরও 777X, আরও ভবিষ্যৎ
দিনের শুরুতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এমিরেটস। দুবাই-ভিত্তিক এই বিমান সংস্থা তাদের বহরে আরও আটটি এয়ারবাস A350-900 যুক্ত করার নতুন ঘোষণা দেয়। এর ফলে তারা মোট ৭৩টি A350–এর অর্ডার ধরে ফেলল। ইতিমধ্যে আকাশে উড়ছে ১৩টি A350, আর নতুন অর্ডারের মাধ্যমে এমিরেটস তাদের লং-হল নেটওয়ার্কে জ্বালানি–সাশ্রয়ী, হালকা–ওজন এবং আরামদায়ক কেবিনের এই সিরিজকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে চাইছে।
এর আগেই এই সপ্তাহে তারা বোয়িংয়ের আসন্ন 777X প্রোগ্রাম থেকে ৬৫টি 777-9 কেনার ঘোষণা দেয়। দুটো মিলে নতুন অর্ডারের তালিকা মূল্যে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪১ বিলিয়ন ডলার। সংখ্যাটা যেমন বড়, সিদ্ধান্তটাও ততটাই কৌশলগত—কারণ বৈশ্বিক বহরে নতুন প্রজন্মের ওয়াইডবডি বিমান তেমন দ্রুত আসছে না, সরবরাহের ওপর চাপ বাড়ছে, আর ভ্রমণচাহিদা উর্ধ্বমুখী।
এমিরেটস চেয়ারম্যান আহমেদ বিন সাঈদ আল মাকতুম দিনের আলোচনায় স্পষ্ট করে দেন, এই বিনিয়োগ শুধুই বহর বৃদ্ধি নয়—আগামী দুই দশকের জন্য বিশ্ব রুটম্যাপে তাদের অবস্থান শক্ত রাখার প্রস্তুতি।
ফ্লাইদুবাই: মধ্যম-দূরত্বের খেলায় আরও বড় অস্ত্র
শুধু এমিরেটস নয়, তাদের সহযোদ্ধা ফ্লাইদুবাইও দিনটাকে নিজেদের মতো করে দখল করে নেয়। মাঝারি আকারের বিমান সংস্থা হলেও তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যে আর মাঝারি নেই, সেটা বোঝা গেল বেশ পরিষ্কারভাবে।
বোয়িংয়ের সঙ্গে বিস্তৃত প্রশিক্ষণ চুক্তি—পাইলট থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ–সংশ্লিষ্ট সব টিমের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ—তাদের দীর্ঘমেয়াদী স্বপ্নকে আরও শক্ত করে। ফ্লাইদুবাই–এর আসন্ন ৩০টি 787-9 ড্রিমলাইনার থাকবে তিন-শ্রেণীর কনফিগারেশনে, আর প্রথমবারের মতো তারা প্রিমিয়াম ইকোনমি চালু করছে।
উড়োজাহাজের অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতাতেও তারা নতুন জোর দিয়েছে। প্যানাসনিক অ্যাভিওনিক্সের Astrovia সিস্টেম—যা ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্টের নতুন প্রজন্ম—তারা বেছে নিয়েছে নতুন ড্রিমলাইনারগুলোর জন্য।
এখানেই শেষ নয়। তারা আগেই ১৫০টি এয়ারবাস A321neo–এর জন্য MoU সই করেছিল। এবার বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৩ বিলিয়ন ডলারের আরেক MoU–তে ৭৫টি নতুন 737 MAX–এর অপশন যুক্ত করল। স্পষ্টই বোঝা যায়, ফ্লাইদুবাই এখন শীর্ষস্থানীয় ন্যারোবডি অপারেটরদের কাতারে উঠতে চাইছে।
বৈশ্বিক নির্মাতাদের ওপর চাপ: প্রতিযোগিতা আর সরবরাহ–সংকট দুই-ই বাড়ছে
এয়ারশোর তৃতীয় দিনটা শুধু অর্ডারের জন্য খবর নয়, শিল্পের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা টানাপোড়েনও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এয়ারবাস ও বোয়িং এখনো বাজারে রাজা, কিন্তু চীনের COMAC এবং রাশিয়ার নিজস্ব বিমান উৎপাদন প্রকল্পগুলো ভবিষ্যতের খেলায় নতুন চাপ তৈরি করছে।
যে অঞ্চলে এত অর্ডার, সেই অঞ্চলে সাপোর্ট সিস্টেমও বাড়ছে দ্রুত। তার উদাহরণ—GE Aerospace–এর ঘোষিত ৫০ মিলিয়ন ডলারের নতুন On-Wing Support কেন্দ্র, দুবাইতেই। এখানকার কৌশলগত অবস্থানকে ধরে রাখতে নির্মাতাদের প্রতিযোগিতা এখন শুধু বিমান বিক্রিতে নয়—রক্ষণাবেক্ষণ, সাপোর্ট, প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বেও।
শিল্প বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক। তাদের মতে, আগামী বছরগুলোতে সরবরাহ–চেইন আর ভূ-রাজনীতি দুই-ই নির্মাতাদের পরিকল্পনা ব্যাহত করতে পারে। অর্ডার যতই হোক, বিমান হাতে পেতে সময় লাগার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
স্ট্যাটিক ডিসপ্লে আর ফ্লাইং শোতে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়
তৃতীয় দিনের মাঠের আবহ ছিল অন্যরকম। রাফায়েল যোদ্ধা বিমানের অ্যাক্রোবেটিক উড়ান যখন আকাশে লুপ নিচ্ছে, ঠিক সেই সময় বহু দর্শকের দৃষ্টি আটকে ছিল রাশিয়ার Su-57E স্টিলথ ফাইটারের দিকে। দুটোই ভিন্ন কারণে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু—একদিকে এরো–ডাইনামিক দক্ষতা, অন্যদিকে সামরিক প্রযুক্তির নতুন ধারা।
স্ট্যাটিক পার্কেও ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বিমানপ্রেমী থেকে শুরু করে প্রকৌশলী, শিক্ষার্থী—সবার ভিড় ছিল সেই সব জায়গায় যেখানে পাইলটরা সরাসরি আলোচনা করছিলেন বিমানের হাতে–কলমে অভিজ্ঞতা নিয়ে।
উদ্ভাবন, আলোচনা আর ভবিষ্যৎ এভিয়েশনের রোডম্যাপ
দুবাই এয়ারশোর আলোচনা অংশটা এবারও ভীষণ সমৃদ্ধ। স্থায়িত্ব—অর্থাৎ ভবিষ্যতের টেকসই আকাশপথ—থেকে শুরু করে Advanced Air Mobility (AAM), স্মার্ট এয়ারপোর্ট প্রযুক্তি—সবকিছু নিয়েই ছিল আলাদা আলাদা সেশন।
‘Vista’ হাবটি স্টার্টআপ আর বিনিয়োগকারীদের মেলবন্ধনের জায়গা হিসেবে দিনজুড়ে সচল ছিল। মহাকাশ–প্যাভিলিয়নেও চলছিল মহাকাশ প্রযুক্তির সঙ্গে বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের ভবিষ্যৎ মিলিয়ে দেখার আলোচনা।
তৃতীয় দিন শেষে ছবি একটাই—অর্ডার জমছে, প্রযুক্তি বদলাচ্ছে, প্রতিযোগিতা বাড়ছে, আর মধ্যপ্রাচ্য আবারও বৈশ্বিক বিমানশিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে। সামনে দুদিন বাকি। কিন্তু এখনই স্পষ্ট, দুবাই এয়ারশো ২০২৫ শুধু নতুন অর্ডার নয়—বিমান বিশ্বের পরবর্তী দশকের দিশা নির্ধারণেই বড় ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে।



