২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনোত্তর যুগে বাংলাদেশের পর্যটন ও এভিয়েশন খাত: জরুরি পরিবর্তন এবং সরকারী উদ্যোগের পথনির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয়ে দেশের রাজনৈতিক গতিপথে একটি গভীর ছাপ ফেলেছে। এরপর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই পরিবর্তনশীল সময়ে, দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পর্যটন এবং এভিয়েশন খাত উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জের কারণে এই খাতদ্বয়ে গভীর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি ১২ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচন এবং সংস্কার সংক্রান্ত গণভোট এই খাতগুলোর ভবিষ্যত নির্ধারণে মূল ভূমিকা পালন করবে। এই নিবন্ধে আমরা এই খাতদ্বয়ের বর্তমান চিত্র, জরুরি পরিবর্তনসমূহ এবং সরকারের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ অর্থনীতির দিকে অগ্রসর করা যায়।

ত্রয়োদশ নির্বাচনের পরবর্তী যুগে বাংলাদেশের পর্যটন খাত একটি চ্যালেঞ্জপূর্ণ পর্যায় অতিক্রম করেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অশান্তি এবং ছাত্র আন্দোলনের ফলে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বাংলাদেশ টুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালে মাত্র ৫৫০,০০০ বিদেশি পর্যটক দেশে এসেছেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে অনেক দেশ বাংলাদেশকে ‘অনিরাপদ’ গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা হোটেল এবং রিসোর্টগুলোর অকুপেন্সি রেটকে ৪০% এ নামিয়ে এনেছে। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষভাগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রিফর্ম ইনিশিয়েটিভসের ফলে কিছুটা পুনরুজ্জীবন দেখা যায়, যেমন ডিসেম্বর মাসে কক্সবাজার এবং সিলেটের রিসোর্টগুলোতে ৭০% অকুপেন্সি রেকর্ড করা হয়েছে। তবুও, পর্যটন খাত জিডিপিতে মাত্র ২.৫% অবদান রাখছে, যা বিশ্ব গড়ের চেয়ে কম। এই খাতের বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে রোড কন্ডিশন উন্নয়ন, পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।

পর্যটন খাতে জরুরি পরিবর্তনের মধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান, কক্সবাজারের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত এবং পাহাড়ী অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বিশ্বমানের গন্তব্যে রূপান্তরিত করতে রাস্তা, হোটেল এবং ইকো-ফ্রেন্ডলি সুবিধা নির্মাণ করা দরকার। বর্তমানে, অনেক পর্যটন স্থানে যোগাযোগ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত, যা পর্যটকদের আকর্ষণে বাধা সৃষ্টি করে। এছাড়া, সাসটেইনেবল টুরিজমের উপর জোর দেয়া জরুরি, যাতে পরিবেশ রক্ষা করে অর্থনৈতিক লাভ অর্জন করা যায়। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বা তাঙ্গুয়ার হাওরের মতো স্থানগুলোর জন্য ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট পরিকল্পনা তৈরি করা দরকার, যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করা এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা জরুরি, যেমন ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধা বাড়ানো। প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের অভাব দূর করতে হসপিটালিটি সেক্টরে স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা দরকার। নেপাল বা শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর সাফল্য থেকে শিক্ষা নিয়ে, বাংলাদেশের পর্যটনকে এশিয়ার শীর্ষ গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পর্যটন খাতের উন্নয়নে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত রিফর্ম বুকলেটে পর্যটনকে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের মূল স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যদিও বিস্তারিত মাস্টার প্ল্যান এখনও চূড়ান্ত করা হয়নি। সরকার প্রাইভেট সেক্টরের সাথে পার্টনারশিপে ইনভেস্টমেন্ট আকর্ষণ করছে, যেমন কক্সবাজারে নতুন রিসোর্ট প্রকল্প এবং সিলেটে ইকো-টুরিজম উন্নয়ন। টুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) সরকারের কাছে ট্যাক্স ছাড় এবং প্রমোশনাল ক্যাম্পেইনের দাবি জানিয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করলে এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। সরকার আন্তর্জাতিক টুরিজম ফেয়ারে অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশকে প্রমোট করছে। কুয়াকাটা এবং পটুয়াখালীকে ওয়ার্ল্ড-ক্লাস ডেসটিনেশনে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। এছাড়া, রুরাল টুরিজম প্রমোট করে গ্রামীণ উন্নয়নকে যুক্ত করা যায়, যা জিডিপিতে অতিরিক্ত অবদান রাখবে।

এভিয়েশন খাতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে, ত্রয়োদশ নির্বাচনোত্তর যুগে এই খাত দ্রুত বর্ধনশীল হয়েছে, কিন্তু চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। ২০২৫ সালে এভিয়েশন জিডিপিতে ১.৫% অবদান রেখেছে এবং প্রায় ৫০০,০০০ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে, ইউএস-বাংলা এবং নভোএয়ারের মতো লোকাল এয়ারলাইন্স আন্তর্জাতিক রুট এক্সপ্যান্ড করেছে, যেমন ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ফ্লাইট। কিন্তু গ্লোবাল এয়ারক্রাফট শর্টেজের কারণে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেখানে বিদেশি ক্যারিয়ারস ৭৫% আন্তর্জাতিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে, বোয়িং-এর সাথে $৩.৭ বিলিয়ন ডিল সাইন করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা ১৪টি এয়ারক্রাফট ক্রয় করবে। এটি ট্রেড ডেফিসিট কমানোর লক্ষ্যে, কিন্তু ইন্টারিম গভর্নমেন্টের ম্যান্ডেট অতিক্রমের অভিযোগ উঠেছে।

এভিয়েশন খাতে জরুরি পরিবর্তনের মধ্যে ফ্লিট এক্সপ্যানশন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন অন্যতম। বোয়িং থেকে ১৪টি প্লেন ক্রয়ের পাশাপাশি এয়ারবাসের সাথে আলোচনা চলছে। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালকে সম্পূর্ণ কার্যকর করা দরকার, যাতে যাত্রী ক্যাপাসিটি বাড়ে। সেফটি স্ট্যান্ডার্ডস উন্নত করতে নতুন রেগুলেশনস চালু করা জরুরি, কারণ ২০২৫ সালে এয়ারক্রাফট শর্টেজের কারণে ফ্লাইট ক্যানসেলেশন বেড়েছে। আন্তর্জাতিক কানেক্টিভিটি বাড়ানো, যেমন পাকিস্তান এবং চীনের সাথে ডাইরেক্ট ফ্লাইট পুনরায় চালু, খাতের বৃদ্ধিকে সহায়তা করবে। লিজিং রেগুলেশনস সংস্কার করে এয়ারক্রাফট অভাব দূর করা দরকার। আইএটিএর প্রজেকশন অনুসারে, ২০৩৮ সাল নাগাদ এয়ার ট্রান্সপোর্ট মার্কেট ১৮০% বাড়বে, যা ১৫০,০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ৪টি কমার্শিয়াল এয়ারলাইন্স চালু রয়েছে, যা প্রতিযোগিতা কমিয়েছে।

সরকারের পদক্ষেপ হিসেবে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এভিয়েশন মিনিস্ট্রির অধীনে নতুন রেগুলেশনস চালু করেছে। বোয়িং এবং এয়ারবাসের সাথে ডিল ফাইনালাইজ করা, যা ইউএস ট্রেড টকসের অংশ, খাতকে শক্তিশালী করবে। প্রাইভেট এয়ারলাইন্সকে ইনসেনটিভ দেয়া, যেমন ট্যাক্স ছাড় এবং ট্রেনিং প্রোগ্রাম, সম্ভব। ইউএস এবং ইইউ-এর সাথে পার্টনারশিপ বাড়ানো খাতের সেফটি এবং ইফিশিয়েন্সি উন্নত করবে। রিফর্ম কমিশনসের প্রস্তাব অনুসারে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা যায়। এয়ারপোর্ট লিজিং এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে বিদেশি ইনভেস্টমেন্ট আকর্ষণ করা সম্ভব, যা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে।

উভয় খাতেই সরকারের উদ্যোগ রিফর্ম-ভিত্তিক হওয়া উচিত। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রিফর্ম কমিশনস, যেমন অ্যান্টি-করাপশন এবং কনস্টিটিউশনাল রিফর্ম, এই খাতগুলোকে প্রভাবিত করছে। ২০২৬-এর নির্বাচন সফল হলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে, যা পর্যটন এবং এভিয়েশনের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে। স্মার্ট বাংলাদেশের ভিশন অনুসারে, টেকনোলজি-ড্রাইভেন উন্নয়ন গ্রহণ করা দরকার, যেমন ডিজিটাল বুকিং সিস্টেম এবং এআই-ভিত্তিক সেফটি টুলস। ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নত করে বর্ডার টুরিজম এবং এয়ার কানেক্টিভিটি বাড়ানো যায়। এফডিআই বাড়ছে, যা ২০২৫-এ ২০% বৃদ্ধি দেখিয়েছে।

উপসংহারে, ত্রয়োদশ নির্বাচনোত্তর যুগে বাংলাদেশের পর্যটন এবং এভিয়েশন খাতে গভীর পরিবর্তন জরুরি, যাতে এগুলো অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পদক্ষেপ যদি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দীর্ঘমেয়াদী হয়, তাহলে দেশের সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে। এই খাতদ্বয়ের উন্নয়ন শুধু জিডিপি বাড়াবে না, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনমান উন্নত করবে এবং বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করবে।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বিএনপি ও তারেক রহমানকে ঐতিহাসিক নির্বাচনী বিজয়ে অভিনন্দন জানাল

Read Next

বসন্তের রঙিন আগমন: ঢাকায় উৎসবের মেলা এবং নতুন প্রাণের স্পন্দন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular