ঢাকা–বরিশাল রুটে আবারও ছন্দ ফিরিয়ে আনল ঐতিহাসিক প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ

ঢাকা–বরিশাল রুটে আবারও ছন্দ ফিরিয়ে আনল ঐতিহাসিক প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদ

পেডেল স্টিমার

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : তিন বছরের বিরতির পর বাংলাদেশের নদীপথে আবার শোনা গেল ঐতিহাসিক স্টিমারের তাল। অনেকটা সময় ধরে অপেক্ষায় থাকা নৌযানপ্রেমীরা এবার নতুনভাবে দেখতে পাচ্ছেন ব্রিটিশ আমলের কিংবদন্তি প্যাডেল স্টিমার পিএস মাহসুদকে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সব প্রস্তুতি শেষ করে অবশেষে ঢাকা–বরিশাল রুটে চলাচল শুরু করেছে এই ঐতিহ্যবাহী জাহাজ।

ঢাকা থেকে বরিশাল—দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে আবার দৌড় শুরু

শুক্রবার সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে যখন পিএস মাহসুদ ঢাকা থেকে রওনা দিল, তখন যাত্রীদের চোখেমুখে ছিল কৌতূহল আর খানিকটা নস্টালজিয়া। তিন বছরের ব্যবধান যাত্রীদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মোট ৩২ জন যাত্রী নিয়ে স্টিমারটি দুপুর-দুপুর নদী পাড়ি দিয়ে ঠিক ১২ ঘণ্টা পরে বরিশালে পৌঁছায়।
বিআইডব্লিউটিসি জানিয়েছে, বরিশালের ঐতিহ্যবাহী স্টিমার ঘাটে সংস্কার কাজ চলায় জাহাজটি আপাতত ত্রিশ গোডাউন ঘাট ব্যবহার করছে। বরিশালে পৌঁছানোর পর জাহাজের ডেকে যাত্রীদের ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানান অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আহসান হাবিব এবং জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন।

দিনভর নদীপথ—যাত্রীদের চোখে যাত্রার রোমাঞ্চ

যাত্রাপথে পিএস মাহসুদ অতিক্রম করে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী, পদ্মা, ডাকাতিয়া, মেঘনা, জয়ন্তী, নয়াভাঙ্গানী এবং আড়িয়াল খাঁ–সহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো। সারাদিন নদীর রূপ দেখাতে দেখাতে যাত্রীদের অনেকেই জানালেন, আধুনিক লঞ্চের ভিড়ে এমন এক ঐতিহ্যবাহী নৌযানে ভ্রমণ এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

যাত্রী ধারণক্ষমতা—সংখ্যায় বড়, অভিজ্ঞতায় আরও বড়

যদিও প্রথম দিনের যাত্রায় যাত্রী ছিল মাত্র ৩২ জন, বিআইডব্লিউটিসির ভাষ্য অনুযায়ী স্টিমারটি ৯৬০ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা রাখে।
গোটা নৌযানে রয়েছে তিন ধরনের শ্রেণিভাগ—

  • প্রথম শ্রেণী: ১২ জন যাত্রী
  • দ্বিতীয় শ্রেণী: ১০ জন যাত্রী, এছাড়া ৪০ জনের জন্য অতিরিক্ত বার্থ
  • ডেক ক্লাস: প্রায় ৯০০ জন যাত্রী

এই শ্রেণিভাগ পুরনো ডিজাইনের স্টিমারগুলোর ঐতিহ্য বজায় রেখেছে। আধুনিক লঞ্চের সঙ্গে তুলনা করলে সুবিধা কম মনে হতে পারে, কিন্তু যারা নস্টালজিক পরিবেশ পছন্দ করেন, তাদের কাছে এই ভ্রমণ অনন্য।

কেন থেমেছিল পিএস মাহসুদের যাত্রা?

দীর্ঘদিন ধরে রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, পুরনো যন্ত্রপাতি এবং অপারেশনাল সমস্যার কারণে ২০২০ সালে জাহাজটিকে পরিষেবা থেকে বাদ দেওয়া হয়। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা–বরিশাল–খুলনা এবং ঢাকা–বরিশাল–মোংলা রুটে নিয়মিত চলাচল করা এই স্টিমারটিকে তখন বাঁচানোর মতো অবস্থায় ছিল না।

পরে স্টিমারটি সংরক্ষণ ও পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় বিআইডব্লিউটিসি। কয়েক বছর ধরে চলা সংস্কার ও আধুনিকায়ন শেষে, ১৫ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় উদ্বোধন করা হয় পিএস মাহসুদকে। ঠিক দুই সপ্তাহের ব্যবধানে যাত্রীসহ প্রথম বাণিজ্যিক ভ্রমণও সম্পন্ন হয়।

আধুনিকায়নের পর নতুন রূপ—পুরনো কাঠামো, আপগ্রেড সুবিধা

প্রায় ৯৭ বছরের পুরনো এ জাহাজটি ১৯২৮ সালে ব্রিটিশ আমলে তৈরি হয়। একসময় “রকেট স্টিমার” নামে খ্যাত জাহাজগুলোর একটি ছিল এটি। ১৯৯০ সালে মূল বাষ্পচালিত ইঞ্জিন বদলে এতে ডিজেল ইঞ্জিন লাগানো হয়।
সাম্প্রতিক সংস্কারে যুক্ত হয়েছে—

  • আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম
  • পুনর্নির্মিত ডেক
  • উন্নত ইঞ্জিন রুম
  • যাত্রীদের থাকার জায়গায় নতুন সাজ

যাত্রীদের মতে, পুরনো সৌন্দর্য বজায় রেখেই নতুনত্ব তৈরি হয়েছে।

রুট ও সময়সূচী—সাপ্তাহিক যাত্রা

পিএস মাহসুদ বর্তমানে সপ্তাহে একবার চলবে।
সময়সূচী:

  • ঢাকা → বরিশাল: প্রতি শুক্রবার সকাল ৮:৩০
  • বরিশাল → ঢাকা: প্রতি শনিবার সকাল ৮:৩০

ভাড়া কাঠামো

বিআইডব্লিউটিসি নির্ধারিত ভাড়া—

  • প্রথম শ্রেণী: ২,৬০০ টাকা
  • দ্বিতীয় শ্রেণী: ১,৬৫০ টাকা
  • ডেক শ্রেণী: ৬০০ টাকা

এই ভাড়া মূলত পর্যটক ও নৌযানপ্রেমীদের কথা মাথায় রেখেই নির্ধারণ করা হয়েছে।

পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা

একটি প্রাচীন নৌযান শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে। স্টিমারটিকে কেন্দ্র করে বরিশাল–ঢাকা নদীপথে নতুন করে পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দেশি–বিদেশি পর্যটকদের অনেকেই ইতোমধ্যে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছেন। পিএস মাহসুদকে ঘিরে যদি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেওয়া যায়, তাহলে নদীভ্রমণ আবার জনপ্রিয় হতে পারে।

কেন এই স্টিমার এতটা গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের হাতে থাকা স্টিমারগুলোর মধ্যে পিএস মাহসুদ এখন একেবারে শেষ দিকের প্রতিনিধি। একসময় পদ্মা–মেঘনার বুক চিরে রাজকীয় ভঙ্গিতে চলা রকেট স্টিমারগুলোর ইতিহাস দীর্ঘ। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই গল্পই তুলে ধরছে এই জাহাজ।

Read Previous

বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনীর পাঁচ দিনব্যাপী মহড়া শেষ পর্যায়ে: সমুদ্র নিরাপত্তায় নতুন আত্মবিশ্বাস

Read Next

১ ডিসেম্বর থেকে সেন্টমার্টিনে জাহাজ চলাচল শুরু: নতুন মৌসুমে রাত্রিযাপনের অনুমতি, কঠোর নির্দেশনায় ভ্রমণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular