২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টাঙ্গাইলের শাড়ি শিল্প পেল ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি

টাঙ্গাইলের শাড়ি

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি বয়নশিল্প আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি ছিনিয়ে আনল। ইউনেস্কো এই শিল্পকে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এতে শুধু একটি কারুশিল্প নয়, বাংলাদেশের প্রজন্মের পর প্রজন্মের সঙ্গে থাকা সাংস্কৃতিক পরিচয়ও বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত হলো।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো ২০০৩ কনভেনশনের আন্তঃসরকারি কমিটির ২০তম অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বাংলাদেশের জন্য এটি ষষ্ঠ একক স্বীকৃতি এবং কমিটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর দ্বিতীয় বড় অর্জন। সরকারের মতে, এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এক মাইলফলক।

বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের প্রধান রাষ্ট্রদূত খন্দকার এম. তালহা এই স্বীকৃতিকে দেশের জন্য “অসাধারণ সম্মান” হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, টাঙ্গাইলের তাঁতিদের দুই শতাব্দীর পরিশ্রম, দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার প্রতি এটি বিশ্বব্যাপী সম্মান। তিনি বিশেষভাবে নারী তাঁতিদের অবদানকে সামনে আনেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্পকে ধরে রেখেছেন এবং নতুন প্রজন্মকে শেখাচ্ছেন।

রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, টাঙ্গাইল শাড়ি শুধু পোশাক নয়—এটি এক ধরনের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার প্রতীক। শত বছরের বেশি সময় ধরে টাঙ্গাইলের তাঁতিরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের বুনন কৌশল ধরে রেখেছেন। তিনি জানান, এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে আরও উৎসাহ যোগাবে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য ঐতিহ্যও ইউনেস্কোর তালিকায় যুক্ত হতে পারে।

৭ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর আনুষ্ঠানিকভাবে অধিবেশন উদ্বোধন করেন। উপস্থিত ছিলেন ইউনেস্কোর নবনিযুক্ত মহাপরিচালক খালেদ এল আনানি। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ঐতিহ্য ও কারুশিল্পকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি এই অধিবেশনে বিশেষভাবে আলোচনায় ছিল।

টাঙ্গাইল শাড়ির পরিচয় তৈরি হয়েছে এর সূক্ষ্মতা, হালকা বুনন, আর নকশার সৃজনশীলতার মাধ্যমে। সাধারণত নরম সুতির সুতো দিয়ে তৈরি এই শাড়ি গরম আবহাওয়ায় আরামদায়ক এবং দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে উৎসব—সব ক্ষেত্রের জন্যই উপযোগী। এর প্রতিটি শাড়িতে দেখা যায় বুটি, পাটা, কাঞ্চিপুরী-অনুপ্রাণিত লাইন, বা জামদানির ছোঁয়া। যদিও জামদানি আলাদা ঐতিহ্য, তবুও টাঙ্গাইল শাড়ির নকশায় তার সূক্ষ্ম প্রভাব স্পষ্ট।

টাঙ্গাইল অঞ্চলের তাঁতিদের দক্ষতা শুধু নকশায় নয়, তাঁতের গতি নিয়ন্ত্রণেও। তাঁত চালানোর সময় বুননের যে ছন্দ—তা অনেকের কাছে সুরের মতো শোনায়। ছোট গ্রাম থেকে শুরু করে বড় বাজার—টাঙ্গাইলের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে এখনও তাঁতের শব্দ শোনা যায়। অনেক পরিবার পুরোপুরি এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল।

তবে এই শিল্প শুধু ঐতিহ্যের সৌন্দর্য নয়, অর্থনীতির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও টাঙ্গাইল শাড়ির ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে এখনকার তরুণ প্রজন্মও এই শাড়িকে আবার জনপ্রিয় করে তুলছে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি যুক্ত হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ সরকারও এই শিল্পকে নতুনভাবে সাজানোর সুযোগ দেখছে। প্রশিক্ষণ, আধুনিক সরঞ্জাম, আর বাজার সম্প্রসারণ—এই তিন ক্ষেত্রকে সামনে রেখে প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে নতুন ডিজাইন তৈরি, বুনন কৌশল নথিভুক্ত করা এবং তাঁতিদের জীবনমান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এক কথায়, টাঙ্গাইল শাড়ি শুধু একটি কারুশিল্প নয়—এটি বাংলার মানুষের সৃজনশীলতা, ধৈর্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা সাংস্কৃতিক অভ্যাসের জীবন্ত দলিল। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি সেই গল্পটিকেই বিশ্বব্যাপী তুলে ধরল নতুন করে। আর এখানেই বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত শক্তি এবং মানুষের শিল্পচেতনার জয় দেখা যায়।

Read Previous

জাফলংয়ের খাসিয়া পল্লি: পর্যটন সম্ভাবনার মাঝে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা সংকট

Read Next

সিএএবি-এর নিরাপত্তা কর্মকর্তা পদে ২৩ জন নির্বাচিত: পুলিশ যাচাই ও মেডিকেল পরীক্ষা শেষে চূড়ান্ত নিয়োগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular