
খাশিয়া পল্লী জাফলং, ছবি : সংগৃহীত
নিজেস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : সিলেটের জাফলং বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় প্রাকৃতিক বিনোদনকেন্দ্র। পিয়াইন নদী, নদীর দুই তীরের পাহাড়ি সবুজ, আর খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলটিকে করে তুলেছে ব্যতিক্রমী এক আকর্ষণ। কিন্তু এই আকর্ষণের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি বড় বাস্তবতা: খাসিয়া পল্লিতে নেই স্বাস্থ্যসেবা, নেই নিরাপত্তা কেন্দ্র, আর নেই পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা। ফলে হাজারো মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যেই চলতে থাকে প্রতিদিন।
জাফলংয়ের বল্লা ঘাটে দাঁড়ালে সীমান্ত পেরিয়ে পাহাড়ি ঢালে যে গ্রাম চোখে পড়ে, সেটিই খাসিয়া পল্লি। সাতটি গোষ্ঠী বা পুঞ্জিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই বসতি, যেখানে প্রায় সাড়ে চার হাজার খাসিয়া মানুষ বসবাস করেন। প্রকৃতি তাদের জীবনের মূল ভরসা—কৃষি, পান-সুপারি, আর স্বল্পমাত্রার পর্যটনই তাদের অর্থনীতির প্রধান শক্তি। কিন্তু নাগরিক জীবনযাপনের জন্য যে ন্যূনতম সুবিধা প্রয়োজন, তার অনেকটাই এখানকার মানুষ এখনও পান না।
চিকিৎসা কেন্দ্র ও নিরাপত্তা ফাঁড়ির অভাব: স্থানীয়দের প্রধান উদ্বেগ
যেকোনো দুর্ঘটনা, অসুখ-বিসুখ বা জরুরি চিকিৎসার সময় খাসিয়া পল্লির মানুষের প্রথম সমস্যা হলো দূরত্ব। কাছাকাছি কোনো ক্লিনিক নেই, নেই ছোটখাটো চিকিৎসাকেন্দ্রও। অসুস্থ হলে প্রায় ৮–১২ কিলোমিটার দূরে যেতে হয়, যা পাহাড়ি অঞ্চলের সরু, ভাঙাচোরা পথে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। বয়স্ক মানুষ, শিশু কিংবা গর্ভবতী নারীদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কঠিন।
শুধু চিকিৎসার অভাবই নয়, নিরাপত্তাও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়রা জানান, পর্যটকদের যাতায়াত বেড়ে গেলেও এলাকাটিতে কোনো পুলিশ ফাঁড়ি নেই। ফলে রাস্তায় ছিনতাই বা সমস্যায় পড়লে দ্রুত নিরাপত্তা সহায়তা পাওয়া যায় না। মাঝে মাঝে হওয়া অপরাধমূলক ঘটনার কারণে পর্যটকরা ভুল ধারণা করে খাসিয়া জনগোষ্ঠীকেই দায়ী করেন, যা এখানকার মানুষের জন্য কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের দাবি—একটি স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি বা নিরাপত্তা পোস্ট থাকলে পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত।
যাতায়াতব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা: পর্যটকদের স্বস্তি, স্থানীয়দের ভোগান্তি
খাসিয়া পল্লির ভেতরে যাতায়াতের প্রধান ভরসা ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক। সরু, উঁচুনিচু এবং খানাখন্দযুক্ত পথ হওয়ায় এগুলোর চলাচলও ব্যাহত হয়। শুষ্ক মৌসুমে পথের ধুলাবালু আর বর্ষায় কাদা—সব মিলিয়ে যাতায়াত পুরো বছরের জন্যই চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকে।
তবুও পল্লির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের টেনে আনে। নদীর অপরূপ সৌন্দর্য, পাহাড়ি মানুষের জীবনযাপন, আর গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শান্ত পরিবেশ পর্যটকদের মনে অন্য ধরনের প্রশান্তি দেয়। যারা ভ্রমণে সরলতার ছোঁয়া খোঁজেন, তাদের কাছে এটি এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। তবে পর্যটকরা প্রায়ই বলছেন—সড়ক উন্নয়ন, সাইনবোর্ড, নিরাপত্তা ও প্রাথমিক চিকিৎসাসহ কিছু ন্যূনতম উদ্যোগ নিলে এলাকা আরও বেশি সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে।
পর্যটনের প্রভাব: সুযোগ বাড়ছে, কিন্তু সুরক্ষা চাই
খাসিয়া পল্লিতে পর্যটক থাকার ব্যবস্থা আছে। ছোট ছোট কটেজ ও একটি রেস্টুরেন্ট এলাকায় স্থানীয় মানুষের আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। সাধারণ বাঙালি খাবারের পাশাপাশি খাসিয়া রেসিপির স্বাদও নিয়ে যেতে পারেন ভ্রমণকারীরা। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে।
এ সুযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি আরও দায়িত্বও তৈরি হয়েছে। পর্যটকের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে, আর পর্যটন মৌসুমে এই বৃদ্ধি কয়েকগুণ বেশি হয়। পর্যটন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ সময় চিকিৎসা-নিরাপত্তা সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। তাদের মতে, এখনই যদি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ফায়ার সার্ভিস ইউনিট, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র এবং স্থানীয়দের জন্য প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি সামলাতে আরও বড় সমস্যা হতে পারে।
পাথর–বালু উত্তোলন: প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শত্রু
প্রকৃতি-নির্ভর জীবনযাপনের জন্য সম্পূর্ণভাবে পরিবেশের ওপর নির্ভর করে খাসিয়া জনগোষ্ঠী। কিন্তু জাফলং এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পাথর ও বালু উত্তোলন চলছে। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও স্বল্প পরিসরে এখনো এই কার্যক্রম দেখা যায়। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পানি স্বচ্ছতা, আর আশপাশের জৈববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি তাদের জীবনযাপনের জন্য ভয়াবহ হুমকি। লামা পুঞ্জির সাবেক হেডম্যান মেকিট লাম্বা সতর্ক করে বলেন, যদি এই উত্তোলন বন্ধ না হয়, তবে জাফলং তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দ্রুত হারাবে। পর্যটন কমবে, আর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
অঞ্চল উন্নয়নে উদ্যোগ জরুরি
জাফলংয়ের খাসিয়া পল্লি শুধু পর্যটন আকর্ষণই নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও জাতিগত ঐতিহ্যের অংশ। তাই এখানকার মানুষের মৌলিক অধিকার—চিকিৎসা, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সড়কব্যবস্থা—নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা, পর্যটন ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ, স্থানীয় মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো এবং অবৈধ পাথর-বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
জাফলংকে যদি টেকসই পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে পারলেই এই অঞ্চল তার প্রকৃত সৌন্দর্য ও সম্ভাবনা ধরে রাখতে পারবে।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ ক



