
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বাংলাদেশের অপার সৌন্দর্যের ভান্ডার ছড়িয়ে রয়েছে দেশের ৬৪টি জেলায়। নীল সমুদ্রের ঢেউ, সবুজ পাহাড়ের শ্রেণি, ঘন ম্যানগ্রোভ বন, প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শন, নদীমাতৃক গ্রামীণ জীবন ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য—এসবই জেলাভিত্তিক পর্যটনের অসীম সম্ভাবনা তুলে ধরে। দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী, বৈচিত্র্যময় ও স্থিতিশীল করতে এই জেলাভিত্তিক পর্যটন এক অমূল্য চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। বর্তমানে পর্যটন খাত জিডিপিতে প্রায় ৩-৪ শতাংশ অবদান রাখলেও সরকারের লক্ষ্য তা ৬-৭ শতাংশে উন্নীত করা। জেলায় জেলায় পর্যটন বিকাশের মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জেলাভিত্তিক পর্যটনের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো স্থানীয় অর্থনীতির চাঙ্গা করা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত, সিলেটের চা-বাগান, সুন্দরবনের ইকো-ট্যুরিজম, রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ, বান্দরবানের পাহাড়ি ট্রেইল কিংবা রাজশাহীর আম-বাগান ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠলে লক্ষ লক্ষ মানুষের আয়ের উৎস তৈরি হবে। হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, হোমস্টে, স্থানীয় পরিবহন, গাইড সার্ভিস, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকানের মাধ্যমে বিশেষ করে গ্রামীণ যুবক-যুবতী ও নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশ্ব ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (WTTC) এবং সরকারি তথ্য অনুসারে, পর্যটন খাত ইতোমধ্যে লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং ভবিষ্যতে এর সম্ভাবনা আরও বৃহৎ। কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম (CBT) মডেল চালু করলে দারিদ্র্য বিমোচন এবং নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হবে।
এছাড়া, জেলাভিত্তিক পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানও বৃদ্ধি করবে। শহরমুখী অভিবাসন কমে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হবে। উদাহরণস্বরূপ, সুন্দরবনের আশপাশের জেলাগুলোতে ইকো-ট্যুরিজম বিকশিত হলে স্থানীয়রা বনের উপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প জীবিকা পাবেন। একইভাবে, পাহাড়ি অঞ্চলের সম্প্রদায়গুলো তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে আয়ের নতুন দুয়ার খুলতে পারবেন।
পর্যটন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বর্তমানে বাংলাদেশ এ খাত থেকে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার আয় করে, যা সঠিক পরিকল্পনায় কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। জেলাভিত্তিক অনন্য আকর্ষণগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করলে রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ ঘটবে এবং অর্থনীতির উপর চাপ কমবে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তসাংস্কৃতিক বিনিময়ও এর মাধ্যমে সম্ভব। সরকারের জাতীয় পর্যটন মাস্টার প্ল্যান (২০২৪-২০৪১) অনুসারে, ২০৪১ সাল নাগাদ বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকারের বহুমুখী ও কার্যকর পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, প্রত্যেক জেলার অনন্য সম্পদ চিহ্নিত করে একটি জেলাভিত্তিক পর্যটন মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করা উচিত। ডেপুটি কমিশনারের নেতৃত্বে জেলা পর্যটন কমিটি গঠন করে ট্যুরিজম ক্লাস্টার তৈরি করতে হবে। বর্তমানে ৩০টির বেশি জেলায় আকর্ষণীয় স্থান চিহ্নিত রয়েছে; এটি সব জেলায় সম্প্রসারণ করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ। সড়ক, রেল, অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর, ইকো-লজ, হোমস্টে এবং ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সুবিধার জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলকে উৎসাহিত করা উচিত। পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, মানবসম্পদ উন্নয়ন। স্থানীয় যুবকদের জন্য গাইড প্রশিক্ষণ, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, ভাষা শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এনজিও ও বেসরকারি খাতের সাথে অংশীদারিত্বে কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজমকে প্রসারিত করা যেতে পারে। নারীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত।
চতুর্থত, আকর্ষণীয় মার্কেটিং ও প্রমোশন। আন্তর্জাতিক ট্রাভেল মেলা, সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন, ভার্চুয়াল ট্যুর এবং “বাংলাদেশের জেলায় জেলায় সৌন্দর্যের সন্ধানে” ধরনের জাতীয় ক্যাম্পেইন চালু করা দরকার। ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং অনলাইন বুকিং সুবিধা বাড়ানো পর্যটক আকর্ষণে সহায়ক হবে।
পঞ্চমত, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতি। ইকো-ট্যুরিজমকে প্রাধান্য দিয়ে ক্যারি ক্যাপাসিটি নির্ধারণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পর্যটনকে যুক্ত করতে হবে। সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপ বা সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় কঠোর নিয়মকানুন প্রয়োগ করা জরুরি।
ষষ্ঠত, আর্থিক প্রণোদনা প্রদান। পর্যটন খাতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ট্যাক্স ছাড়, স্বল্প সুদে ঋণ এবং জমি বরাদ্দের সুবিধা দিতে হবে। স্থানীয় কৃষি ও হস্তশিল্পের সাথে পর্যটনের সরবরাহ চেইন গড়ে তোলা উচিত।
সপ্তমত, নীতি ও আইনি কাঠামো শক্তিশালীকরণ। জাতীয় পর্যটন নীতির আধুনিকায়ন করে জেলা পর্যায়ে বাস্তবায়নযোগ্য আইন প্রণয়ন এবং ন্যাশনাল ট্যুরিজম কাউন্সিলকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
চ্যালেঞ্জ অবশ্যই রয়েছে—অবকাঠামোর ঘাটতি, নিরাপত্তা উদ্বেগ, দক্ষ জনবলের অভাব এবং প্রচারের অপ্রতুলতা। তবে মৌলভীবাজার বা বান্দরবানের সফল সিবিটি মডেল দেখিয়ে বোঝা যায়, সঠিক উদ্যোগে এসব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।
উপসংহারে, জেলাভিত্তিক পর্যটন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হাতিয়ার নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ এবং পরিবেশ রক্ষারও মাধ্যম। সরকার যদি দূরদর্শী পরিকল্পনা, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে, তাহলে ২০৪১ সালের মধ্যে পর্যটন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভে পরিণত হবে। প্রত্যেক জেলাকে পর্যটনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরার সময় এসেছে। এ উদ্যোগ বাংলাদেশের সোনালি ভবিষ্যতের পথকে আরও উজ্জ্বল করবে।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ


