
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা কোনো না কোনো ঐতিহ্য বা স্বাদের জন্য বিখ্যাত। আর কুষ্টিয়ার বুকে গড়ে ওঠা এক অনন্য স্বাদের ঠিকানা হলো ‘জিলাপিপাড়া’। এই পাড়া কেবল একটি নাম নয়—এটি একপ্রকার সংস্কৃতি, যা মিষ্টিপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে বহু বছর ধরে। ভ্রমণপ্রেমী ও খাদ্যরসিক পর্যটকদের জন্য জিলাপিপাড়া হয়ে উঠছে এক বিশেষ গন্তব্য।
কোথায় অবস্থিত?
কুষ্টিয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রের কাছেই অবস্থিত জিলাপিপাড়া। পুরান বাজার এলাকা থেকে সামান্য দূরে পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির হাট। এটি কুষ্টিয়া পৌরসভার আওতাধীন এলাকায় অবস্থিত, যেখানে শত বছরের পুরনো মিষ্টির দোকানগুলো এখনও জ্বলজ্বল করছে ঐতিহ্যের আলোয়।
জিলাপির বিশেষত্ব কী?
কুষ্টিয়ার জিলাপির স্বাদ যেমন অতুলনীয়, তেমনি তার গন্ধও মন কাড়ে পথচারীদের। এই এলাকার জিলাপিগুলো বাইরে খাস্তা, ভেতরে তুলতুলে, আর চিনির রসে ভেজা। মূলত দেশি খাঁটি খেজুরের গুড় ও ঘি ব্যবহার করেই প্রস্তুত হয় এখানকার বিশেষ ‘মহিলা জিলাপি’ ও ‘ঘিয়ে ভাজা জিলাপি’।
স্থানীয় ভাষায় কেউ কেউ একে “গোলাপ জিলাপি” বলেও ডাকে—কারণ তা গোলাপের পাপড়ির মতো মোচড়ানো হয়। ভোর থেকে শুরু হয় জিলাপি তৈরির প্রস্তুতি, আর সকাল ৭টা নাগাদ দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে।

ঐতিহ্যের পেছনের গল্প
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কুষ্টিয়ার এই জিলাপিপাড়ার ইতিহাস প্রায় ৮০ বছরের পুরনো। পাকিস্তান আমলে এখানে গড়ে ওঠা প্রথম মিষ্টির দোকান ‘হাবিব মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ থেকেই শুরু। এরপর একে একে বাড়তে থাকে দোকান সংখ্যা, বাড়তে থাকে খ্যাতি। আজ এই পাড়ায় ২৫টিরও বেশি মিষ্টির দোকান রয়েছে, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জিলাপির ঐতিহ্য বহন করে আসছে।
ভ্রমণকারীদের জন্য টিপস
- সকালেই যান: ভোরে বানানো তাজা জিলাপির স্বাদই আলাদা। তাই সকাল ৭টা থেকে ১০টার মধ্যে যাওয়াই শ্রেয়।
- প্যাকেট নিয়ে আসুন: অনেক পর্যটক এখানকার জিলাপি কিনে নিয়ে যান পরিবার-পরিজনের জন্য। দোকানগুলো বিশেষ প্যাকেট সুবিধা দেয়।
- লোকালদের সঙ্গে কথা বলুন: স্থানীয়দের কাছ থেকে শুনতে পাবেন বহু অজানা গল্প এবং জিলাপির বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা।
ভোজনের পাশাপাশি সংস্কৃতি
জিলাপিপাড়া শুধু মিষ্টির জন্য বিখ্যাত নয়, এই এলাকাটি পুরান কুষ্টিয়ার সঙ্গে একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পাশে রয়েছে পুরনো বইয়ের দোকান, চায়ের স্টল, লালন ও রবীন্দ্র সংগীতচর্চার আসর, যা পর্যটকদের জন্য বাড়তি আনন্দের খোরাক।
কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে কুষ্টিয়া শহরে এসে রিকশা বা সিএনজিতে করে সহজেই যাওয়া যায় জিলাপিপাড়ায়। শহরের যেকোনো জায়গা থেকে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছানো সম্ভব।
ভ্রমণ মানেই শুধু পাহাড়-নদী-সাগর নয়, স্বাদ আর সংস্কৃতির খোঁজও। কুষ্টিয়ার জিলাপিপাড়া এমনই এক স্থান, যেখানে মিষ্টির স্বাদে মিশে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ভালোবাসা। তাই কুষ্টিয়ায় এলে একপ্লেট গরম জিলাপি না খেয়ে ফিরে যাওয়া মানে ভ্রমণটা অসম্পূর্ণ রেখে যাওয়া!
আপনার কুষ্টিয়া সফরকে পূর্ণতা দিতে ভুলবেন না, একবার ঘুরে আসুন জিলাপিপাড়া থেকে। হয়তো জিলাপির এক কামড়েই আপনি ফিরে পাবেন শৈশবের সেই মিষ্টি স্মৃতি।
প্রতিবেদন: পর্যটন সংবাদ প্রতিবেদক



