
ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : চিকুনগুনিয়া রোগের দ্রুত বিস্তার নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। মশাবাহিত এই ভাইরাসজনিত রোগের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বাংলাদেশসহ চারটি অঞ্চলের জন্য লেভেল–২ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)। এই সতর্কতার আওতায় ভ্রমণকারীদের ‘অতিরিক্ত সতর্কতা’ অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সিডিসির সর্বশেষ ঘোষণায় বলা হয়েছে, বর্তমানে কিউবা, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং দক্ষিণ চীনের গুয়াংডং প্রদেশে চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব এলাকায় ভ্রমণের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন নাগরিকদের জন্য এ সতর্কতা জারি করা হলেও, বিষয়টি বৈশ্বিক পর্যটন ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ার অঞ্চলগুলোতে এডিস প্রজাতির মশার বিস্তার বাড়ায় চিকুনগুনিয়া সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এই মশাই ডেঙ্গু ও জিকার মতো রোগের বাহক হিসেবেও পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, নগরায়ণ, অপরিকল্পিত বসতি, পানি জমে থাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণত হঠাৎ জ্বর এবং জোড়ায় জোড়ায় তীব্র ব্যথা দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যথা এতটাই তীব্র হয় যে রোগীর দৈনন্দিন চলাফেরা ব্যাহত হয়। পাশাপাশি মাথাব্যথা, মাংসপেশির ব্যথা, জোড়ায় ফোলা এবং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। সংক্রমিত মশার কামড়ের তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে উপসর্গ প্রকাশ পায়। যদিও অধিকাংশ রোগী এক সপ্তাহের মধ্যে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন, তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে জোড়ার ব্যথা দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু ঢাকা শহরেই অন্তত ৭০০ জন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর পাশাপাশি অন্যান্য শহর ও উপশহরেও রোগটির উপস্থিতি নজরে আসছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই রোগীরা পরীক্ষার বাইরে থেকে যান।
ডব্লিউএইচওর সর্বশেষ বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একই সময়কালে বিশ্বব্যাপী সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের মধ্যে ১৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম, তবুও রোগটির ব্যাপক সংক্রমণ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
চিকুনগুনিয়ার কোনো নির্দিষ্ট কার্যকর চিকিৎসা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। চিকিৎসা মূলত উপসর্গভিত্তিক, অর্থাৎ জ্বর ও ব্যথা কমানোর ওষুধ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের ওপর নির্ভরশীল। তবে আশার কথা হলো, রোগটি টিকাপ্রতিরোধযোগ্য। সিডিসিসহ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব দেশে বর্তমানে প্রাদুর্ভাব চলছে সেখানে ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকলে আগেই টিকা নেওয়া উচিত। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
ভ্রমণ সতর্কতার অংশ হিসেবে সিডিসি মশা থেকে সুরক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ভ্রমণকারীদের নিয়মিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার, লম্বা হাতা ও পুরো পা ঢেকে রাখা পোশাক পরা এবং যেখানে থাকবেন সেই জায়গার আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পানি জমতে পারে এমন সব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার করার কথাও বলা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ভ্রমণ সতর্কতা জারি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। স্থানীয় পর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। বাংলাদেশসহ আক্রান্ত দেশগুলোতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে চিকুনগুনিয়ার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
চিকুনগুনিয়ার এই ক্রমবর্ধমান প্রাদুর্ভাব আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, মশাবাহিত রোগ এখন আর শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো সতর্কতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই পারে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথ দেখাতে।



