পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: বাংলাদেশের আলোকচিত্র শিল্পের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র চঞ্চল মাহমুদের জীবনযাত্রা ছিল সৃজনশীলতা, নিষ্ঠা ও সমাজসচেতনতায় ভরা। তিনি শুধু একজন ফ্যাশন ও মডেল আলোকচিত্রীই ছিলেন না—একজন পথপ্রদর্শক, শিক্ষক এবং পর্যটনপ্রেমী শিল্পী হিসেবেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। সম্প্রতি তাঁর মৃত্যু দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখা হয়েছে।
শিল্পচর্চার শুরু থেকেই চঞ্চল মাহমুদের আলোকচিত্রে ছিল মানুষের মুখ, মাটির গন্ধ ও বাস্তব জীবনের গল্প। নব্বইয়ের দশকে যখন ফ্যাশন ফটোগ্রাফি দেশে পেশাদার রূপ নিতে শুরু করেছিল, তখন তিনি ছিলেন এই ধারার অন্যতম অগ্রগামী। অসংখ্য বিখ্যাত ফটোশুট ও ম্যাগাজিন কাভারে তাঁর কাজ জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু আলোকচিত্র শুধু রঙিন সাজ নয়, বাস্তবতাও তুলে ধরার মাধ্যম—এই বিশ্বাস থেকেই তিনি যুক্ত হন সামাজিক সচেতনতামূলক প্রকল্পে।
চঞ্চল মাহমুদের আলোকচিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পর্যটন ও প্রকৃতি নিয়ে তাঁর আগ্রহ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল—সুন্দরবন, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, পাহাড়ি পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটের চা-বাগান কিংবা বরেন্দ্রভূমির ইতিহাসঘেরা অঞ্চল—এসব জায়গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তিনি আলোকচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তাঁর ছবি শুধু শিল্পকর্ম নয়, সেগুলো ছিল বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনার জীবন্ত বিজ্ঞাপন।
চঞ্চল মাহমুদ নিয়মিত ভ্রমণ করেছেন এবং তাঁর সংগ্রহে থাকা আলোকচিত্রগুলো দেশে-বিদেশে বহুবার প্রদর্শিত হয়েছে। দেশের পর্যটন বোর্ড, ভ্রমণ সংস্থা এবং বিভিন্ন এনজিও’র প্রকল্পেও তাঁর আলোকচিত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এসব কাজে তাঁর সৃষ্টিশীলতা শুধু চোখে নয়, চিন্তায়ও জায়গা করে নেয়।
একজন আলোকচিত্রী হিসেবে তিনি ছিলেন উদার মনের মানুষ, যিনি নিজের অর্জন ছড়িয়ে দিতে ভালোবাসতেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণদের আলোকচিত্র শেখাতে যুক্ত ছিলেন। দেশের প্রায় সব বড় ফটোগ্রাফি কর্মশালা ও ক্যাম্পে তাঁকে দেখা যেত প্রশিক্ষক হিসেবে। তাঁর হাতে তৈরি হয়েছে শত শত তরুণ আলোকচিত্রী, যারা এখন দেশ-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন এই আলোকযোদ্ধা। শেষ বিদায়ের সময় তাঁর সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা জানান, চঞ্চল মাহমুদের মতো শিল্পী কেবল ছবি তোলেন না—তাঁরা সময়কে ধরে রাখেন, সমাজকে আলোকিত করেন।
চঞ্চল মাহমুদের আলোকচিত্র শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, এর পর্যটন শিল্প ও সাংস্কৃতিক জগতে একটি আলাদা অধ্যায় হয়ে থাকবে।
পর্যটন সংবাদ তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানায় এবং তাঁর আলোকিত জীবনের স্মরণে তাঁকে উৎসর্গ করে এই নিবন্ধ।



