
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: মাত্র তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে দেশের যেকোনো ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তৈরি হচ্ছে ভুয়া জন্মনিবন্ধন সনদ। এই জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে জড়িত কিছু ইউনিয়ন পরিষদের সচিব, উদ্যোক্তা এবং কিছু অসাধু ব্যক্তি। সময় সংবাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র, এমনকি পাসপোর্টও। এতে জাতীয় নিরাপত্তা যেমন হুমকির মুখে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে।
জন্মসনদ বাণিজ্যের বিস্তার
রাজবাড়ী, ফরিদপুর, ঠাকুরগাঁও, ঢাকা—জেলার সীমা ছাড়িয়ে জালিয়াতি ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রিশাদ মণ্ডল, রবিন ফকির, সুমন মুন্সী এবং মো. রিমনসহ অন্তত পাঁচজন বিভিন্ন সময়ে একাধিক জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করেছেন, যেগুলোর অনেকগুলো তাদের নিজ জেলার বাইরের।
রিশাদ মণ্ডলের আছে তিনটি জন্মসনদ—রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে। সৌদি আরবে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বয়স বাড়িয়ে তৈরি করেছেন নতুন সনদ ও এনআইডি। তবে তথ্যের গরমিলের কারণে একাধিকবার তার আবেদন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
একই কৌশলে রবিন ফকিরও ফরিদপুর সদর থেকে ভুয়া জন্মসনদ তৈরি করেছেন। চাঁদপুর ইউনিয়ন থেকে মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকায় করা এই সনদ জমা পড়তেই ধরা পড়ে গরমিল। তার পরিচয়পত্র তৈরির আবেদন বাতিল করা হয়।
ইউনিয়ন পরিষদ ও ডিজিটাল সেন্টার কর্মীদের সম্পৃক্ততা
জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরির ক্ষেত্রে ইউপি সচিবদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আবেদন গ্রহণ, তথ্য যাচাই, সফটওয়্যারে তথ্য এন্ট্রি ও চূড়ান্ত অনুমোদন—সবই সচিবের তত্ত্বাবধানে হয়। চূড়ান্ত অনুমোদন দেন ইউপি চেয়ারম্যান।
তবে এমনকি যখন স্বাক্ষর জাল করা হচ্ছে তখনও প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহৃত হচ্ছে? কেননা জন্মনিবন্ধন সিস্টেমে দ্বি-স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ওটিপি ব্যবস্থাও রয়েছে।
রাজবাড়ীসহ বিভিন্ন জেলার ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তাদের গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে গড়ে উঠেছে এ জালিয়াতির নেটওয়ার্ক। এক উদ্যোক্তার স্বীকারোক্তি মতে, দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় কেনা জন্মনিবন্ধন গ্রাহক পর্যায়ে বিক্রি হয় তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায়।
নির্বাচন কমিশনের উদ্বেগ
রাজবাড়ী জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা সেক মুহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, “প্রতিদিনই এমন মানুষ ভোটার হতে আসে, যাদের জন্মনিবন্ধন ও ঠিকানায় গরমিল থাকে। তারা বয়স বাড়িয়ে বা কমিয়ে এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরি করতে চায়। এতে আমরা বিব্রত হই এবং জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকিতে পড়ে।”
প্রশাসনের হুঁশিয়ারি
ফরিদপুরের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. সোহরাব হোসেন বলেন, “এ ধরনের জালিয়াতির বিষয়ে আগে জানা ছিল না। কেউ যদি জড়িত থাকে, তাহলে অবশ্যই আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।”
জন্মনিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি সনদ যখন পণ্য হয়ে যায় গোপন গ্রুপে, তখন তা শুধুই নয় একটি নৈতিক অবক্ষয়ের ছবি—বরং পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি এক ভয়াবহ হুমকি। এখনই যদি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এই দুর্নীতি আরও গভীর হবে।



