
ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত কয়েক বছর ধরেই চাপের মুখে ছিল, কিন্তু সম্প্রতি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে খেলাপি ঋণ দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে খেলাপি ঋণে জর্জরিত পাঁচটি ইসলামিক ব্যাংককে একত্রিত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার পথে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী রবিবার কনসোলিডেটেড ইসলামিক ব্যাংক পিএলসি নামের নতুন সত্তার অনুমোদন দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মনসুর শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক সম্মেলনে জানান, বিশেষ বোর্ড মিটিংয়ে নতুন ব্যাংকের কাঠামো এবং ভবিষ্যৎ কার্যপদ্ধতি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হবে। তার ভাষায়, খাতটিকে সঠিক পথে ফেরাতে এখন দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
খেলাপি ঋণের বেড়াজালে ব্যাংকিং ব্যবস্থা
দেশের ব্যাংক খাতে সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬.৫ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতিতে যে পরিমাণ টাকা পাঠানো হয়েছে, তার প্রায় ৩৭ শতাংশ কার্যত অচল। সহজ হিসাব—একটি ব্যাংক ১০০ টাকা ঋণ দিলে তার ৩৭ টাকাই আর ফিরে আসে না।
বিশেষত যেসব ব্যাংক একীভূত হচ্ছে, তাদের মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ অনুপাত ৯২ থেকে ৯৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা যেকোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিপজ্জনক পর্যায়।
এমন অনুপাত শুধু ব্যাংকের নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিকে ধীর করে দেয়। কারণ ঋণ খেলাপি বেড়ে গেলে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কমে যায়, উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে দ্বিধায় পড়েন এবং আর্থিক বাজারে আস্থার সংকট তৈরি হয়।
সরকারের ২০ হাজার কোটি টাকার সহায়তা
সংকট সমাধানে সরকার নতুন ব্যাংকের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। প্রথম ধাপে অনুমোদন পাওয়ার পরই ১০ হাজার কোটি টাকা জমা দেওয়া হবে। এই অর্থ মূলত আটকে থাকা আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হবে।
অনেক আমানতকারী কয়েক মাস ধরেই তাদের অর্থ আটকে পড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। নতুন তহবিল ও ব্যাংক পুনর্গঠনের মাধ্যমে এই উদ্বেগ কিছুটা কমবে বলে ব্যাংক কর্মকর্তারা মনে করছেন।
গভর্নর নিশ্চিত করেছেন যে দক্ষ কর্মীদের রাখা হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ছাঁটাই এড়ানো হবে। পাশাপাশি, আমানত বীমা প্রকল্পের আওতায় আমানতের একটি বড় অংশ সুরক্ষিত থাকবে, যা সাধারণ গ্রাহকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
নতুন ব্যাংকের কার্যক্রম কীভাবে শুরু হবে
একীভূত ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি নতুন চলতি হিসাব খুলবে। তহবিল জমার পর ধাপে ধাপে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। একই সময়ে, পূর্ববর্তী পাঁচ ব্যাংকের জটিল সম্পদ-দায় হিসাব একত্র করে নতুন ব্যবস্থাপনায় আনা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পুনর্গঠন সফল করতে হলে স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতের অনিয়ম নজর এড়িয়ে গেলে একই সংকট আবার ফিরে আসতে পারে।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ এবং গভর্নরের ব্যাখ্যা
সম্মেলনে উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতারা জ্বালানি সমস্যার কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের হার এবং সামগ্রিক অনিশ্চয়তার বিষয়টি তুলে ধরেন। তারা মনে করেন, আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতা বাজারে নতুন বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে।
গভর্নর ব্যাখ্যা করেন, আমদানি বিলের মোট মূল্য কমলেও আমদানির প্রকৃত পরিমাণ স্থির রয়েছে। অর্থাৎ অতীতে যেভাবে বাড়তি মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাচারের সুযোগ ছিল, এখন সেই পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। এটি ইতিবাচক দিক হলেও খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি এখনো পুরো সেক্টরকে ঝুঁকির মুখে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আস্থাহানির ঝুঁকি
খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশি ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক লেনদেনে বাড়তি চাপের মুখে পড়ছে। বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। এর ফল—এলসি খোলা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, কমিশন বাড়ছে, শর্ত আরও কঠোর হচ্ছে।
আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আস্থাহানি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ধীর হলে রপ্তানি ও আমদানির পুরো শৃঙ্খলই ব্যাহত হবে।
যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হতে যাচ্ছে, তাদের আর্থিক অবস্থার কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া এখন আর শুধু কাঠামোগত সংস্কার নয়, বরং জরুরি হস্তক্ষেপ। রবিবারের অনুমোদন দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারে—যদি তা স্বচ্ছতা, শক্তিশালী নজরদারি এবং সুশাসনের ওপর ভিত্তি করে বাস্তবায়ন করা যায়।



