২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কেন্টাকিতে ইউপিএস কার্গো বিমান বিধ্বস্ত: আগুনে পুড়ে ৭ জন নিহত, তদন্তে এফএএ ও এনটিএসবি

ছবি: সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যের লুইসভিল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে মঙ্গলবার বিকেলে একটি ইউপিএস কার্গো বিমান ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাছের শিল্প এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। তীব্র বিস্ফোরণের পর মুহূর্তেই আগুন ধরে যায়, যার ফলে অন্তত সাতজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

বিধ্বস্তের মুহূর্ত

বিমানটি ছিল ম্যাকডোনেল ডগলাস এমডি-১১ মডেলের, যা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে মালামাল পরিবহনের দায়িত্বে ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই বিমানটির বাম দিকের ইঞ্জিনে আগুন দেখা যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং বিমানবন্দরের তিন মাইল দক্ষিণে থাকা একটি শিল্প এলাকায় গিয়ে আছড়ে পড়ে। সংঘর্ষের সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন পুরো এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় সম্প্রচার মাধ্যম WLKY কর্তৃক প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার পর আগুনে আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। দমকলকর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন। দুর্ঘটনাস্থল থেকে অন্তত তিনটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, বাকিদের সন্ধান এখনো চলছে।

সরকারি বিবৃতি ও তদন্ত

কেন্টাকির গভর্নর অ্যান্ডি বেশেয়ার এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, “এটি এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। উদ্ধারকর্মীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন। আমরা মৃত ও আহতদের পরিবারকে সহায়তা করতে প্রস্তুত।”

গভর্নর আরও জানান, দুর্ঘটনাস্থলটি একটি পেট্রোলিয়াম পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রতিষ্ঠানের সংলগ্ন, যেখানে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হয়। স্থানীয় সময় রাত ৯টার পর আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।

অন্যদিকে ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ) এবং ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (এনটিএসবি) যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ইঞ্জিনে আগুন লাগা বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা হয়নি।

ইউপিএস-এর প্রতিক্রিয়া

বিশ্বখ্যাত প্যাকেজ ডেলিভারি প্রতিষ্ঠান ইউপিএস এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের একটি কার্গো বিমান দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে, যেখানে তিনজন ক্রু সদস্য ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি নিহত ও আহতদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেনি, তবে জানিয়েছে যে তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে।

ইউপিএস-এর মুখপাত্র বলেন, “আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। আমাদের কর্মীদের নিরাপত্তা সর্বদা অগ্রাধিকার পায়। এই ঘটনায় যারা প্রভাবিত হয়েছেন, তাদের পরিবারের পাশে আমরা আছি।”

প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, দুর্ঘটনার পর লুইসভিল কেন্দ্রে তাদের প্যাকেজ বাছাই কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। লুইসভিল শহরটি ইউপিএস-এর প্রধান মার্কিন বিমান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যেখান থেকে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার ফ্লাইট পরিচালিত হয় এবং দুই শতাধিক দেশে প্যাকেজ পাঠানো হয়। কোম্পানির মালিকানায় রয়েছে ৫১৬টি বিমান, যার মধ্যে ২৯৪টি সরাসরি ইউপিএসের এবং বাকিগুলো ভাড়া বা চার্টারে পরিচালিত।

বিমান চলাচলে প্রভাব

দুর্ঘটনার পরপরই লুইসভিল মুহাম্মদ আলী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, রানওয়ে ১৭আর থেকে উড্ডয়নের পরই বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে। এ ঘটনায় বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় এবং বিমানবন্দরের আশপাশে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়।

বিমানবন্দর পুলিশের মুখপাত্র জোনাথন বেভিন বলেন, “আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং আশপাশের স্থাপনা সুরক্ষিত রাখা। উদ্ধারকাজ এখনও চলছে।”

সরকারি অচলাবস্থা ও প্রশাসনিক প্রভাব

এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সরকারি অচলাবস্থার (government shutdown) মধ্যে। এর ফলে ফেডারেল কর্মীদের একটি বড় অংশ কাজ করতে পারছেন না, যা বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।

পরিবহন সচিব শন ডাফি সতর্ক করে বলেন, “বিমান নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের ঘাটতির কারণে আমাদের আকাশসীমায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। কিছু ফ্লাইট বাতিল করতে হচ্ছে, আবার কিছু রুট সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।”

তিনি এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে লিখেছেন, “লুইসভিলের দুর্ঘটনাটি হৃদয়বিদারক। নিহতদের পরিবার এবং ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের জন্য আমরা প্রার্থনা করছি।”

যুক্তরাষ্ট্রে বিমান দুর্ঘটনার ধারাবাহিকতা

এই বছরের শুরুতেও যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটি বড় দুর্ঘটনা ঘটে। জানুয়ারিতে একটি আমেরিকান ঈগল বিমান ওয়াশিংটনের রোনাল্ড রিগ্যান জাতীয় বিমানবন্দরের বাইরে একটি ব্ল্যাক হক সামরিক হেলিকপ্টারের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, যাতে ৬৭ জন নিহত হন।
সেই ঘটনার পর বিমান চলাচল নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরনো যন্ত্রপাতি, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব বিমান নিরাপত্তার বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

লুইসভিলের এই দুর্ঘটনা শুধু একটি মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং মার্কিন বিমান পরিবহন ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলোকেও আবার সামনে এনেছে। এখন নজর সব তদন্তকারীদের দিকে—তারা কীভাবে এই ভয়াবহ ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করে এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেয়, সেটিই দেখার বিষয়।

Read Previous

ঝিনাইদহ-১ আসনে ভোটে লড়তে যাচ্ছেন অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান

Read Next

মাইলস্টোনে বিমান বিধ্বস্ত: পাইলটের উড্ডয়ন ত্রুটি দায়ী, ঢাকার বাইরে হবে সব ট্রেনিং

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular