১৮/০৪/২০২৬
৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাপ্তাই হ্রদের নিচে ঘুমিয়ে থাকা ইতিহাস: চাকমা রাজার রাজপ্রাসাদ

কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলের নিচে প্রায় ৬৫ বছর ধরে জলমগ্ন হয়ে আছে চাকমা রাজার ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদ। রাঙামাটি শহরের চেঙ্গীমুখ এলাকায় জেলা প্রশাসকের বাসভবনের সামনে পূর্বপাশে অবস্থান করা এই রাজবাড়ী শুধু স্থাপত্য নয়, এক করুণ অধ্যায়েরও স্মারক।

১৯৬০ সালে কর্ণফুলী নদীর ওপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় কৃত্রিম হ্রদ ‘কাপ্তাই হ্রদ’ সৃষ্টি হয়। এর ফলেই ডুবে যায় রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা, তলিয়ে যায় লক্ষাধিক মানুষের বসতভিটা ও ৫৪ হাজার একর আবাদি জমি। ডুবে যায় চাকমা রাজবংশের ৮৪ বছরের শাসনকাল দেখা রাজপ্রাসাদটিও।

শুষ্ক মৌসুম এলেই যখন হ্রদের পানি নেমে আসে, তখন মাঝেমধ্যেই এই স্মৃতিধন্য স্থাপনাটির অংশ বিশেষ ভেসে ওঠে জলের উপরে। বিশেষ করে ১৯৮৬ ও ২০০৬ সালে পানির উচ্চতা অতিরিক্ত হারে কমে গেলে রাজপ্রাসাদটি প্রায় পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়েছিল। তখনও প্রায় অক্ষত ছিল প্রাসাদটি, তবে অসচেতনতার কারণে অনেকে সেখান থেকে ইট খুলে নিয়ে গেছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্যে, এই রাজপ্রাসাদ কেবল একটি ভবন নয়— এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দুঃখ, বেদনা ও গর্বের স্মারক। হ্রদের ধারে দাঁড়িয়ে বহু মানুষ এখনো পুরোনো ইতিহাসকে স্মরণ করেন, রাজবাড়ীর ঝলমলে অতীতের কল্পনায় হারিয়ে যান।

চাকমা রাজাদের আদি রাজধানী ছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া। সেখানেই বসে রাজত্ব করতেন কিংবদন্তি রাণী কালিন্দী রায়, যিনি ১৮৭৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার ছেলে রাজা হরিশ্চন্দ্র পরবর্তীতে রাজধানী স্থানান্তর করে রাঙামাটিতে গড়েন নতুন রাজপ্রাসাদ— যা এখন কাপ্তাই হ্রদের তলদেশে।

চাকমা সার্কেলের বর্তমান রাজকার্যালয়ের কর্মকর্তা সুব্রত চাকমা জানান, “রাজপ্রাসাদের পাশেই ছিল একটি ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধবিহার ও বিশাল বুদ্ধমূর্তি, যা আজও হ্রদের তলে রয়েছে। প্রাসাদ থেকে একটি কামান উদ্ধার করে নতুন রাজকার্যালয়ের পাশে রাখা হয়েছে।”

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান স্মৃতিচারণ করে বলেন, “শৈশবে রাজপুণ্যাহ দেখতে গিয়েছিলাম সেই রাজবাড়ীতে। তখন ভাবতেও পারিনি এত সুন্দর স্থাপনাটি একদিন পানির নিচে চলে যাবে। এই প্রাসাদ যেন শুধু ঐতিহ্যের নিদর্শন নয়, কাপ্তাই হ্রদের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া শত শত জীবনের ইতিহাস।”

বিভিন্ন মহল মনে করেন, সরকারের উচিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া। জেলা প্রশাসকের বাংলোর নিকটে প্রাসাদটি ঘিরে তৈরি হতে পারে একটি দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্র, যা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সচেতন করবে।

Read Previous

শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত হচ্ছে, মূলধনে সহায়তা দেবে সরকার

Read Next

রাঙামাটির কাপ্তাই লেকে ‘গোলাপি’ হাতি শাবক! দেশে প্রথমবারের মতো বিরল রঙের হাতি দেখা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular