কক্সবাজারে বর্জ্য সংকট: পর্যটন নগরীর সৌন্দর্য হারানোর পথে

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: বিশ্ব পর্যটন দিবসে দেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার নতুন করে আলোচনায় এসেছে—তবে এবার সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং বর্জ্য সংকট ও পরিবেশ দূষণের কারণে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর হিসেবে খ্যাত কক্সবাজার একসময় ছিল দেশের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর স্থান। কিন্তু অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অব্যবস্থাপনা ও যত্রতত্র স্থাপনার কারণে শহরের স্বাভাবিক সৌন্দর্য এখন মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে।

শহরের বিভিন্ন জায়গা এখন কার্যত ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। খুরুশকুল সেতু, বার্মিজ মার্কেট, লালদীঘি ও গোলদীঘিরপাড় এলাকায় প্রতিদিন জমছে বর্জ্যের স্তূপ। বিশেষ করে বাঁকখালী নদীর ওপর নির্মিত খুরুশকুল সেতু—যেখানে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল—সেখানকার একপাশ এখন শহরের সবচেয়ে বড় আবর্জনার স্তূপে ঢেকে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নিয়মিত না থাকায় সমস্যা আরও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। স্কুল শিক্ষক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা এলাকাবাসী এই ময়লার ভাগাড়ে অতিষ্ঠ। এখান থেকে নানা রোগ ছড়াচ্ছে। শুধু নামেই যদি পর্যটন নগরী হয়, তাতে লাভ কী?”

নদীতে সরাসরি মল-বর্জ্য, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য ৫ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও কটেজ থাকলেও এর মধ্যে খুব অল্প সংখ্যক স্থাপনায় রয়েছে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি)। প্রায় সব হোটেল-মোটেলের মল-বর্জ্য সরাসরি ফেলা হয় বাঁকখালী নদীতে, যা পরে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশে পরিবেশ দূষণ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ওপর বড় হুমকি তৈরি করছে।

সবুজ আন্দোলন কক্সবাজার শাখার সভাপতি অধ্যাপক নুরুল আমিন সিকদার ভুট্টো বলেন, “দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এখানে আসেন শান্ত পরিবেশ উপভোগ করতে। কিন্তু যেভাবে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং এসটিপির অভাব রয়েছে, তাতে কক্সবাজারের স্বাভাবিকতা হারিয়ে যাচ্ছে।”

আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই

১৯৯৯ সালে সরকার কক্সবাজার সৈকতকে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে এবং সৈকতের বেলাভূমিতে স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করে। ২০১৭ সালে হাইকোর্টও ইসিএ এলাকায় সব ধরনের নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু বাস্তবে এই আইন কার্যকর হয়নি। কলাতলী ও লাবণী পয়েন্টে প্রতিনিয়ত নতুন হোটেল-মোটেল তৈরি হচ্ছে, যেগুলোর বেশিরভাগেই নেই পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন জানান, ৩৫০টির বেশি হোটেল-মোটেলকে এসটিপি স্থাপনের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে জায়গার সংকট থাকায় অনেকেই তা করতে পারছে না। এ সমস্যা সমাধানে সেন্ট্রাল এসটিপি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আ. মান্নান বলেন, “ইসিএ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। পাশাপাশি মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী ভবন নির্মাণ চলবে। কক্সবাজারকে দূষণমুক্ত করতে প্রতিটি স্থাপনাতেই এসটিপি বাধ্যতামূলক করা হবে।”

সম্প্রতি বন ও পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান মন্তব্য করেন, “ইসিএ এলাকায় দখল ও উচ্ছেদ এখন অনেকটা টম অ্যান্ড জেরির মতো। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কক্সবাজার শুধু দূষিতই হবে না, তার পর্যটন আকর্ষণও হারাবে।”

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

পরিবেশবিদরা মনে করেন, কক্সবাজারকে টিকিয়ে রাখতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। পুরনো হোটেল-মোটেলগুলোতে পরিবেশবান্ধব সংস্কার এবং এসটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করতে হবে। নইলে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত হয়তো আর বেশিদিন পর্যটকদের আকর্ষণ ধরে রাখতে পারবে না।

Read Previous

বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে ভ্রমণ ভিসা: যা যা জানা জরুরি

Read Next

বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ: বাংলাদেশে নানা কর্মসূচি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular