কক্সবাজারে পর্যটনের চাপ বাড়ছে, কিন্তু সুযোগ-সুবিধা বাড়ছে না

কক্সবাজার প্রতিনিধি| পর্যটন সংবাদ: বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে প্রতি বছর পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু তাদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না। হোটেল-গেস্টহাউস ভরা থাকলেও শহরের খাবারের দাম, পরিবহনের ভাড়া আর অব্যবস্থাপনা পর্যটকদের জন্য বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে।

পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে, বিনোদন নয়

কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, ২০২৩ সালে কক্সবাজারে পর্যটক এসেছিলেন ৬০ লাখ, ২০২৪ সালে ৭০ লাখ এবং এ বছর তা ৮০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু বিনোদনের নতুন কোনো ব্যবস্থা হয়নি। একসময় সৈকতে বালুর ভাস্কর্য মেলা, ঘুড়ি উৎসব, বিচ কার্নিভ্যাল, সার্ফিং প্রতিযোগিতা ও কনসার্টের আয়োজন হতো। নিরাপত্তার অজুহাতে গত এক দশক ধরে এসব বন্ধ।

সৈকতে মৃত্যু ফাঁদ

সুগন্ধা, কলাতলী, সিগাল ও লাবণি পয়েন্টে প্রতিদিন লাখো মানুষ গোসলে নামলেও সাগরে লুকানো গুপ্তখালগুলোর ঝুঁকি রয়ে গেছে। লাল নিশানা দিয়ে সতর্ক করা হলেও পর্যটকেরা তা মানেন না। সি-সেফ লাইফগার্ডের তথ্যমতে, গত ১২ বছরে তারা ৮২৩ জন পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করেছেন, কিন্তু ৬৫ জনের লাশও তুলতে হয়েছে। তহবিল সংকটে এই সেবাও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে।

ভেঙে পড়ছে পুরোনো বিনোদনকেন্দ্র

হিমছড়ির ঝরনা শুকিয়ে গেছে, দরিয়ানগরের শাহেনশাহ গুহা আর উখিয়ার কানারাজার গুহা পর্যটকশূন্য। সংস্কারের অভাব, নিরাপত্তাহীনতা ও দখলদারিত্বে পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ধ্বংসের পথে। ঝাউবাগানে ঢুকলে ছিনতাইয়ের শিকার হতে হচ্ছে পর্যটকদের।

পরিবহনে নৈরাজ্য

কক্সবাজার শহরের ভেতরে যানজট, বাইরে যেতে চাইলে লাগছে আকাশছোঁয়া ভাড়া। টেকনাফ যেতে খোলা জিপের ভাড়া ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার টাকা। ইনানী বা হিমছড়ি যেতে কয়েক হাজার টাকা খরচ। অধিকাংশ টমটম ও অটোরিকশা চালাচ্ছেন অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকেরা, যার কারণে দুর্ঘটনা বেড়েছে। সন্ধ্যার পর মেরিন ড্রাইভে ভ্রমণ অনিরাপদ হয়ে ওঠে।

উৎসবের মৌসুমে চাপ

দুর্গাপূজা ও টানা ছুটিকে ঘিরে আগামী ১২ দিনে প্রায় ৯ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। হোটেল-রিসোর্টগুলো ইতিমধ্যেই বুকিং পূর্ণ। তবে অনেক হোটেল-রেস্তোরাঁয় বাড়তি ভাড়া ও খাবারের দাম নিয়ে পর্যটকেরা অভিযোগ তুলেছেন। শহরের অন্ধকার রাস্তায় চুরি-ছিনতাই, সিসি ক্যামেরার অচল অবস্থা, ভিক্ষুকদের উৎপাত পর্যটনের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।

উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. সালাহউদ্দিন জানান, সৈকতজুড়ে কেবল কার ও অ্যাকুয়ারিয়ামের মতো নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে কক্সবাজারের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাবে।

পর্যটকের সংখ্যা বেড়ে চললেও কক্সবাজার এখনো সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি, নিরাপত্তাহীনতা আর অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। বিশ্বের দীর্ঘতম সৈকতকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

Read Previous

বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ: বাংলাদেশে নানা কর্মসূচি

Read Next

পূর্বাচল থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরে নৌভ্রমণ: তিন দিনের অপূর্ব অভিজ্ঞতা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular