২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইজরায়েল-মার্কিন যৌথ হামলার পর ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণ সতর্কতা: পর্যটন শিল্পে ব্যাপক ধাক্কা

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, শনিবার সকালে ইজরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও বার্তায় ঘোষণা করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘মেজর কমব্যাট অপারেশন’ শুরু করেছে।ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এটিকে ‘প্রিএমপটিভ স্ট্রাইক’ বলে অভিহিত করে বলেছেন, এর উদ্দেশ্য ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের হুমকি দূর করা। এই ঘটনার পরপরই বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাদের নাগরিকদের ইরান, ইজরায়েল, লেবানন, ইরাকসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ভ্রমণ বা পর্যটনের জন্য কঠোর সতর্কতা জারি করেছে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে তাদের নাগরিকদের দেশ ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইরানের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা ‘লেভেল ৪: ডু নট ট্রাভেল’ বহাল রেখেছে এবং নাগরিকদের অবিলম্বে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। একইসঙ্গে ইজরায়েল ও ওয়েস্ট ব্যাংকের জন্য ‘লেভেল ৩: রিকনসিডার ট্রাভেল’ জারি করে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাকালীন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইজরায়েল ছাড়ুন। জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের অ-জরুরি কর্মী ও পরিবারকে অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মার্কিন দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বাণিজ্যিক ফ্লাইট যতক্ষণ চলছে, ততক্ষণ ইজরায়েল ছাড়ার কথা বিবেচনা করুন।” এই সতর্কতার ফলে আমেরিকান পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং ইজরায়েলের পর্যটন খাত, যা ইতোমধ্যে গত বছরের সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত, আরও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যও একই পথ অনুসরণ করেছে। ব্রিটিশ ফরেন অফিস ইরান থেকে তাদের কূটনৈতিক কর্মীদের অস্থায়ীভাবে সরিয়ে নিয়েছে এবং নাগরিকদের ‘অল বাট এসেনশিয়াল ট্রাভেল’ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। ইজরায়েল ও ওয়েস্ট ব্যাংকের জন্যও নন-এসেনশিয়াল ভ্রমণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ড একযোগে ইজরায়েল, জেরুজালেম ও ওয়েস্ট ব্যাংকে নন-ভাইটাল ভ্রমণের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা জারি করেছে। জার্মান ফরেন অফিস নাগরিকদের খাদ্য, পানি ও ওষুধ মজুত রাখতে এবং নিকটস্থ বোম্ব শেল্টারের অবস্থান জানতে বলেছে। ইতালি তার নাগরিকদের ইরান থেকে অবিলম্বে ফিরে আসতে বলেছে এবং ইরাক-লেবাননেও ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করেছে। এই ইউরোপীয় দেশগুলোর সতর্কতায় পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে যারা ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন।

এশিয়া মহাদেশ থেকেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভারতের তেহরান দূতাবাস তার নাগরিকদের “যেকোনো উপলব্ধ পরিবহন, বাণিজ্যিক ফ্লাইটসহ” ইরান ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। চীনও গতকাল (২৭ ফেব্রুয়ারি) তার নাগরিকদের ইরান থেকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং নতুন করে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, “বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ইরানে ভ্রমণ এড়িয়ে চলুন এবং যারা আছেন তারা অতি সতর্কতা অবলম্বন করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসুন।” দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, সার্বিয়া, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, সাইপ্রাস, ব্রাজিলসহ আরও অনেক দেশ একই ধরনের সতর্কতা জারি করেছে। অস্ট্রেলিয়া ইজরায়েল ও লেবানন থেকে কূটনৈতিক কর্মীদের পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছে এবং নাগরিকদের “দেশ ছাড়ার কথা বিবেচনা করুন” বলেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সতর্কতাগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত বিবৃতি না দিলেও, ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশের পদক্ষেপ দেখে ধারণা করা যায় যে বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ, বিশেষ করে ইরান, ইজরায়েল বা লেবাননে যাওয়া এড়িয়ে চলতে বলা হবে। বাংলাদেশের হাজার হাজার প্রবাসী সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত। যদিও এই দেশগুলোতে সরাসরি হামলার আশঙ্কা কম, তবু আকাশপথ বন্ধ হওয়া, ফ্লাইট বাতিল এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে তাদের ফেরত আসা বা যাতায়াত ব্যাহত হতে পারে।বাংলাদেশি পর্যটকদের যারা দুবাই, জর্ডান বা তুরস্ক ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদেরও পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে।

এই সতর্কতাগুলোর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পে তাৎক্ষণিক ধাক্কা লেগেছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক এয়ারলাইন্স, যেমন এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ ও ইতিহাদ ইতোমধ্যে ফ্লাইট রুট পরিবর্তন করেছে এবং কিছু ফ্লাইট বাতিল করেছে। ইউরোপ-এশিয়া রুটের অনেক ফ্লাইট মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ এড়িয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ভাড়া বেড়েছে এবং যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে। ইজরায়েলের পর্যটন খাত, যা ধর্মীয় পর্যটন ও টেকনোলজি-সম্পর্কিত ভ্রমণের জন্য বিখ্যাত, এখন ভয়াবহ সংকটে। গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকেই ইজরায়েলের হোটেল বুকিং কমেছে ৭০ শতাংশেরও বেশি।ইরানের পর্যটন তো প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। দুবাই, আবুধাবির মতো গাল্ফ গন্তব্যগুলো, যা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য জনপ্রিয়, এখন বুকিং কমতে শুরু করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় তাহলে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন আয় ৩০-৪০ শতাংশ কমতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা পর্যটকদের পরামর্শ দিচ্ছেন যে, যেকোনো মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ পুনর্বিবেচনা করুন। ভ্রমণ বীমা নিশ্চিত করুন যাতে যুদ্ধ বা অস্থিরতার কভারেজ থাকে। পাসপোর্ট, ভিসা ও জরুরি যোগাযোগের তথ্য সবসময় সঙ্গে রাখুন। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও দূতাবাসের আপডেট নিয়মিত চেক করা উচিত। অনেক দেশের দূতাবাস ইতোমধ্যে হটলাইন চালু করেছে যাতে আটকে পড়া নাগরিকরা সাহায্য পান।

এই ঘটনা শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক ও মানবিক দিক থেকেও বিশ্বকে প্রভাবিত করছে। তেলের দাম বেড়ে যাওয়া, আকাশপথ বন্ধ এবং পর্যটনের ক্ষতি—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা সবার আগে। যতক্ষণ না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, ততক্ষণ মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এই সমন্বিত সতর্কতা প্রমাণ করে যে, বর্তমান সংঘাতের ঝুঁকি কতটা গভীর এবং ব্যাপক। আশা করা যায়, কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় শিগগিরই শান্তি ফিরবে এবং পর্যটন শিল্প পুনরুদ্ধার করবে। কিন্তু বর্তমানে সকল পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।

Read Previous

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের নতুন কমিটি গঠন

Read Next

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স মধ্যপ্রাচ্যের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular