২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইংল্যান্ডে শতাব্দীর ভয়াবহ খরার আশঙ্কা, পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে জরুরি প্রস্তুতি

ছবি: সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : আগামী বছর ইংল্যান্ডে দেখা দিতে পারে দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা—এমন আশঙ্কায় নড়েচড়ে বসেছে দেশটির সরকার ও পানি সরবরাহ প্রতিষ্ঠানগুলো। গড় বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় এখন থেকেই জরুরি পর্যায়ের পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এটি শতাব্দীর অন্যতম বড় পানি সংকটে রূপ নিতে পারে।

গত গ্রীষ্মেই ইউরোপের এই দেশটির বড় অংশ খরাপ্রবণ হয়ে পড়ে। ভূমির আর্দ্রতা কমে যায়, কৃষিক্ষেত্র শুকিয়ে যেতে থাকে, এমনকি অনেক অঞ্চলে পানির চাহিদা সরবরাহ ছাড়িয়ে যায়। এবারের শীত মৌসুমও শুষ্ক হওয়ার আশঙ্কায় ইংল্যান্ডের পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় এখন বাড়ছে চাপ ও উদ্বেগ—যা আগামী বছরে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া ও জলাধারের সংকট
ইংল্যান্ডের জলাধারগুলোর গড় সংরক্ষণ ক্ষমতা বর্তমানে নেমে এসেছে ৬৩ শতাংশে, যেখানে মৌসুমি গড় প্রায় ৭৬ শতাংশ। দক্ষিণ ইংল্যান্ডের কিছু এলাকায় এই হার ৩০ শতাংশের নিচে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও উদ্বেগজনকভাবে নেমে গেছে এবং পুনরায় পূরণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে।
গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে বৃষ্টিপাত প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আসন্ন শীতেও গড়ের তুলনায় বৃষ্টি কম হবে। ফলে পানির ঘাটতি পূরণে কোনো স্বস্তি আসার সম্ভাবনা নেই।

সরকার ও পানি সরবরাহ সংস্থার প্রস্তুতি
ইতোমধ্যেই ব্রিটিশ সরকার জরুরি পর্যায়ের পানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ‘হোসপাইপ নিষেধাজ্ঞা’—অর্থাৎ বাগানে পানি ছিটানো, গাড়ি ধোয়া, কিংবা ব্যক্তিগত সুইমিংপুলে পানি ভরাটের মতো কাজে নিষেধাজ্ঞা। প্রয়োজন হলে এই বিধিনিষেধ আরও কঠোর হতে পারে।
ইংল্যান্ডের অন্যতম প্রধান পানি সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের এক নির্বাহী বলেন, “এবারের শীত যদি শুকনো যায়, তাহলে আগামী গ্রীষ্মে আমরা তীব্র পানি সংকটের মুখে পড়ব। জলাধারে পর্যাপ্ত মজুত না থাকলে সরবরাহে বড় ধরণের সংকট তৈরি হবে।”

বাণিজ্যিক খাতেও সীমাবদ্ধতা
দক্ষিণ ইংল্যান্ডের কয়েকটি স্থানীয় পানি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক পানি ব্যবহারে নতুন সীমাবদ্ধতা আরোপের আবেদন করেছে। এতে ভবন ধোয়া, বৃহৎ পরিসরে সেচ কার্যক্রম, এবং বাণিজ্যিক বিনোদনকেন্দ্রে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনার প্রস্তাব রয়েছে। এই বিধিনিষেধ কার্যকর হলে শিল্প ও পর্যটন খাতেও প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
চার্টার্ড ইনস্টিটিউশন অব ওয়াটার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্টের নীতি পরিচালক অ্যালেস্টার চিশলম বলেছেন, “যদি টানা দুই শীত মৌসুম শুষ্ক থাকে, তাহলে সেটি হবে প্রকৃত বিপদের সূচনা। তখন শুধু গৃহস্থালি নয়, কৃষি, নদী ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “ইংল্যান্ডের পানি নিরাপত্তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে নাজুক। জনসংখ্যা বাড়ছে, গ্রীষ্ম ক্রমেই উষ্ণ হচ্ছে, অথচ নতুন কোনো জলাধার গত তিন দশকে নির্মিত হয়নি। বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে ভবিষ্যতের চাহিদা সামলানো সম্ভব নয়।”

ভবিষ্যতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইংল্যান্ডকে এখনই নতুন জলাধার নির্মাণ, পানি পুনঃব্যবহার প্রযুক্তি, এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে দৈনন্দিন পানির অপচয় বন্ধে।
বর্তমানে দেশটির অনেক পরিবারেই প্রতি ব্যক্তি গড়ে প্রতিদিন ১৪০ লিটার পানি ব্যবহার করে। এই পরিমাণ কমিয়ে আনতে সরকার প্রচারণা চালাচ্ছে, তবে বাস্তবে সাফল্য তেমন আসছে না।

সব মিলিয়ে, ইংল্যান্ড এখন এমন এক সঙ্কটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি ফোঁটা পানির মূল্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। প্রকৃতি যদি আগামী কয়েক মাসে দয়া না করে, তাহলে দেশটিকে কঠোর পানি রেশনিং, কৃষি ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক চাপের সম্মুখীন হতে হবে—যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন হতে পারে।

Read Previous

যুক্তরাষ্ট্রে শাটডাউনের ধাক্কা: ফ্লাইট বাতিল ও দেরিতে যাত্রায় চরম ভোগান্তি

Read Next

মারাত্মক দুর্ঘটনার পর UPS ও FedEx সাময়িকভাবে গ্রাউন্ড করল সব MD-11 কার্গো বিমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular