
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : আজ ১ মে, বিশ্ব মে দিবস। শ্রমিক অধিকারের ঐতিহাসিক দিনটিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে ছুটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত’। ঢাকায় শ্রমিক সংগঠনগুলো মিছিল, সমাবেশ ও আলোচনা সভার মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তার দাবি তুলছে। কিন্তু দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে—কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট, সুন্দরবন বা পাহাড়ি এলাকায়—যারা প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের সেবা দিয়ে খাতটিকে চালিয়ে রাখছেন, তাদের অনেকের জন্য এই দিনটিও সাধারণ কর্মদিবস। ছুটির আনন্দ তাদের কাছে বিলাসিতা।
বাংলাদেশের পর্যটন খাত বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারের ‘ট্যুরিজম মেগা প্ল্যান’-এর লক্ষ্য ২০৪০ সালের মধ্যে ৫৫.৭ মিলিয়ন পর্যটক আকর্ষণ করে ২১.৯ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। বর্তমানে এই খাতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫.১৯ মিলিয়ন মানুষ কর্মরত। অন্যান্য সূত্র অনুসারে, পর্যটন জিডিপিতে ৩-৫ শতাংশ অবদান রাখছে এবং সরাসরি ৩ মিলিয়নের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, গাইড, সৈকত ব্যবসায়ী, হস্তশিল্প বিক্রেতা—এই সবকিছুর সঙ্গে জড়িত শ্রমিক ও কর্মীরা এই খাতের মেরুদণ্ড।
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হোটেল কর্মীরা অতিথিদের সেবায় ব্যস্ত। অনেকে ১০-১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় কাজ করেন। সিজনাল ট্যুরিস্ট রাশের সময় (যেমন ঈদ বা লং উইকেন্ড) তাদের কর্মঘণ্টা আরও বেড়ে যায়। একজন হোটেল ওয়েটার বা রুম বয়ের মাসিক মজুরি প্রায়ই ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যা জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ২০২৬ সালের শুরুতে হোটেল-রেস্তোরাঁ শ্রমিকদের জন্য সরকার ন্যূনতম মজুরি ১৩,০৫০ টাকা ঘোষণা করলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে তা এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে অনেক কর্মী অভিযোগ করেন যে, ওভারটাইমের টাকা নিয়মিত পান না বা বোনাস থেকে বঞ্চিত হন।
কুয়াকাটা বা সিলেটের চা বাগান সংলগ্ন পর্যটন এলাকায়ও একই চিত্র। স্থানীয় যুবক-যুবতীরা গাইড, বোট চালক, হস্তশিল্প বিক্রেতা বা ছোট হোমস্টে চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু অফ-সিজনে তাদের আয় অনেক কমে যায়। পর্যটন খাতের সিজনাল প্রকৃতির কারণে অনেক শ্রমিকের চাকরি অস্থায়ী। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা, পেনশন বা স্বাস্থ্যবীমার সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। গরমের তীব্রতা, বর্ষায় বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও কাজ চালিয়ে যেতে হয়। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরম, পানির অভাব, বিশ্রামের সুযোগ না পাওয়া এবং চাপের কারণে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে।
পর্যটন শ্রমিকদের একটি বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। বাংলাদেশ লেবার অ্যাক্ট ২০০৬-এর আওতায় অনেক সুবিধা থাকলেও হোটেল-রেস্তোরাঁ বা ছোট ট্যুর অপারেটরদের ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন দুর্বল। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ সীমিত, ফলে দাবি-দাওয়া তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। মে দিবস উপলক্ষে শ্রমিক নেতারা বারবার বলছেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, শ্রমিক ডাটাবেজ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কভারেজের আওতায় আনা জরুরি। পর্যটন খাতকে পূর্ণাঙ্গ ‘শিল্পখাত’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মজুরি কাঠামো নির্ধারণের দাবিও দীর্ঘদিনের।
তবে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি আশার আলোও রয়েছে। সরকার পর্যটন মাস্টার প্ল্যানের মাধ্যমে তিনটি এক্সক্লুসিভ ট্যুরিজম জোনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়ন, কুয়াকাটা ও পাহাড়ি এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম এই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। যদি প্রশিক্ষিত কর্মীদের বেতন-ভাতা, কর্মঘণ্টা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পর্যটন সত্যিকারের ‘গ্রোথ ইঞ্জিন’ হয়ে উঠবে।
একজন কক্সবাজারের হোটেল কর্মী বলেন, “পর্যটকরা ছবি তুলে আনন্দ করেন, কিন্তু আমরা যারা তাদের থাকা-খাওয়া-ঘোরাঘুরির ব্যবস্থা করি, আমাদের ছুটি কবে?” মে দিবসে এই প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। শ্রমিকদের ঘামে পর্যটন খাত বিকশিত হচ্ছে, অথচ তাদের অধিকার এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পর্যটন খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য মজুরি, ৮ ঘণ্টার কর্মদিবস, স্বাস্থ্যসেবা, বীমা ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। ২০২৬ সালের মে দিবস যেন শুধু স্মরণের দিন না হয়ে বাস্তব পরিবর্তনের অঙ্গীকারের দিন হয়ে ওঠে। যখন পর্যটকরা সুন্দর সৈকত বা সবুজ পাহাড় উপভোগ করবেন, তখন যেন পেছনে থাকা শ্রমিকরাও ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে কাজ করতে পারেন।
পর্যটন খাতের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো বা বিপণন নয়, এটি মানুষকেন্দ্রিক হতে হবে। শ্রমিকদের সুস্থ, দক্ষ ও সন্তুষ্ট রাখতে না পারলে টেকসই পর্যটন সম্ভব নয়। এই মে দিবসে বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রিক শ্রমিক ও কর্মীদের জন্য ন্যায়বিচার ও সম্মানের দাবি উচ্চারিত হোক। সুস্থ শ্রমিকই পারে কর্মঠ হাতে নতুন প্রভাত আনতে।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ


