
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : পর্যটন খাতকে চাঙা করার লক্ষ্যে গৃহীত উদার ভিসা নীতির সুবিধা এখন নিজেরাই সংকুচিত করতে যাচ্ছে থাইল্যান্ড সরকার। দেশটির ৯৩টি দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসামুক্ত অবস্থানের মেয়াদ ৬০ দিন থেকে কমিয়ে ৩০ দিন করার প্রস্তাব অনুমোদনের পথে রয়েছে। বিদেশি নাগরিকদের অবৈধ ব্যবসা, আইন লঙ্ঘন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে থাই কর্তৃপক্ষ।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকে মঙ্গলবার সরকারের কাছে এই প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট বুধবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রস্তাবটি শুধু ভিসামুক্ত অবস্থানের মেয়াদ কমানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর আওতায় বিনিয়োগ ভিসা, দীর্ঘমেয়াদী রেসিডেন্সি পারমিট এবং স্টুডেন্ট ভিসার যোগ্যতার মানদণ্ডও পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা করা।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, রাশিয়া, সুইজারল্যান্ড, ভারত, চীন, মালয়েশিয়া ও জাপানসহ ৯৩টি দেশের নাগরিকরা বর্তমানে ভিসা ছাড়াই ৬০ দিন থাইল্যান্ডে অবস্থান করতে পারেন। এই উদার নীতি কোভিড-১৯ মহামারির পর পর্যটন খাত পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে পর্যটন অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ২০২৩-২৪ সালে দেশটিতে কয়েক কোটি বিদেশি পর্যটক এসেছেন, যা জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। তবে এই সুবিধার অপব্যবহার নিয়ে ক্রমশ অসন্তোষ বাড়ছে।
সম্প্রতি রাশিয়ান, চীনা এবং অন্যান্য দেশের কিছু প্রবাসী থাই নাগরিকদের নাম ব্যবহার করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা, বিদেশি মালিকানা আইন লঙ্ঘন এবং স্থানীয় বাজারে অন্যায্য প্রতিযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। থাই নাগরিকরা অভিযোগ করছেন যে, বিদেশিরা অনেক ছোট-বড় ব্যবসা দখল করে নিচ্ছেন, পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন এবং স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সংকটে ফেলছেন। বিশেষ করে ব্যাংকক, ফুকেট, পাতায়া এবং চিয়াং মাইয়ের মতো জনপ্রিয় পর্যটন এলাকায় এ ধরনের ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে।
থাইল্যান্ড সরকার এসব অভিযোগের চাপে পড়ে ভিসা নীতি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল স্পষ্ট করেছেন যে, ভিসামুক্ত নীতি পুরোপুরি বাতিল করা হবে না। কারণ পর্যটন এখনো দেশের আয়ের অন্যতম বড় উৎস। সরকারের লক্ষ্য হলো ভারসাম্য রক্ষা করা—একদিকে পর্যটকদের আকর্ষণ ধরে রাখা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
এই পদক্ষেপের ফলে স্বল্পমেয়াদি পর্যটকদের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। যারা দীর্ঘদিন থেকে কাজ বা ব্যবসা করতে চান, তাদের জন্য নিয়মিত ভিসা বা অন্যান্য আইনি পথ অনুসরণ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে অবৈধ অভিবাসন ও অর্থনৈতিক শোষণ কমবে, কিন্তু সামগ্রিক পর্যটন আয়ে সাময়িকভাবে হ্রাস পেতে পারে। থাই চেম্বার অব কমার্সসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন এই সংস্কারকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে তারা সরকারকে সতর্ক করে দিয়েছে যেন অতিরিক্ত কড়াকড়ি পর্যটন শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
আন্তর্জাতিক পর্যটকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকে এটিকে নিয়মিতকরণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে মনে করছেন, আবার কেউ কেউ এতে থাইল্যান্ডের আকর্ষণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার ডিজিটাল নোমাড এবং দীর্ঘমেয়াদি ভ্রমণকারীরা নতুন নিয়মে অসুবিধায় পড়তে পারেন।
থাইল্যান্ডের এই উদ্যোগ আঞ্চলিক পর্যটন নীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলো যেমন মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া তাদের ভিসা নীতি পর্যালোচনা করতে উৎসাহিত হতে পারে। সামগ্রিকভাবে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পর্যটনের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকার আশা করছে, এই সংস্কারের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে পর্যটন খাতকে আরও টেকসই ও নিয়ন্ত্রিতভাবে বিকশিত করা সম্ভব হবে। পরবর্তী কয়েক মাসে প্রস্তাবটি কেবিনেট ও সংসদে অনুমোদিত হলে নতুন নিয়ম কার্যকর হবে। এর আগে বিস্তারিত গাইডলাইন প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
থাইল্যান্ডের এই সিদ্ধান্ত পর্যটন-নির্ভর দেশগুলোর জন্য একটি বড় শিক্ষা। উদার নীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনে, কিন্তু তার সঙ্গে সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগ না থাকলে স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়। থাই সরকার এখন সেই ভারসাম্য খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
সূত্র: রয়টার্স



