
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : রাজধানী ঢাকার সড়ক-মহাসড়ক এখন ব্যাটারিচালিত রিকশায় সয়লাব। অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক পর্যন্ত সর্বত্র এই তিন চাকার বাহনের দাপট চোখে পড়ার মতো। চালকদের কোনো লাইসেন্স নেই, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের কোনো বালাই নেই এবং গাড়ির আইনি নিবন্ধনও অনুপস্থিত। তবুও এরা যেন সড়কের অঘোষিত রাজা। প্রায় ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণ করছে ঢাকার রাজপথ। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের ছত্রছায়ায় পরিচালিত এই যানবাহন নগরজীবনে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। ফলে বেড়েছে দুর্ঘটনা ও তীব্র যানজট। পাশাপাশি প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খাচ্ছে এসব রিকশা, যার বড় অংশই অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চুরি করা হচ্ছে।
সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আগামী ১৪ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ডিএমপি ও ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসবেন। এই বৈঠকে যানজট নিরসন ও অবৈধ রিকশা নিয়ন্ত্রণের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে যানজট বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি হচ্ছে। আমরা এটি দ্রুত সমাধান করতে চাই। ইতোমধ্যে ডিএমপি কমিশনার ও ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। ১৪ মে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হবে। আশা করি দ্রুত সমাধান মিলবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “চালকের কোনো অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ ছাড়া রিকশা চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে যাত্রী ও পথচারীদের মারাত্মক আহত হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। গত দুই বছরে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার যে ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে, তা হতাশাজনক। এখন এদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে কারণ এ পেশায় জড়িতরা আন্দোলনের হুমকি দিতে পারে। সরকারকে দ্রুত শৃঙ্খলায় আনার উদ্যোগ নিতে হবে।”
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীতে গড়ে উঠেছে প্রায় ১৩ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজ। প্রতিটি গ্যারেজে গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি রিকশা রয়েছে। এসব গ্যারেজে মোট ৬৫ হাজার ৯৬৪টি চার্জিং স্টেশন রয়েছে, যা প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে। অথচ ডিপিডিসির বৈধ চার্জিং স্টেশন মাত্র ২ হাজার ১৪৬টি। বাকি সবই অবৈধ। অনেক গ্যারেজ মালিক আবাসিক মিটার ও চোরাই লাইন ব্যবহার করে রিকশা চার্জ করছেন। গ্যারেজ মালিকরা দিনে ৭০ থেকে ১৫০ টাকা ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল দেখিয়ে মুনাফা লুটছেন।
এসব রিকশার অধিকাংশ চালক আসেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে। তাদের কোনো প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা ছাড়াই রিকশা তুলে দেওয়া হয়। মূল মালিকানা থাকে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের হাতে। তারা দিনে ৫০০ টাকার বিনিময়ে দিনমজুর ও নিম্নবিত্ত মানুষের হাতে রিকশা তুলে দেন। অনেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগেও অল্প সময়ে অধিক আয়ের আশায় এ ধরনের রিকশা তৈরি করেছেন। ফলে নিয়ন্ত্রণহীন এই যানবাহন সড়কে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে।
মানিকনগর, মুগদা, যাত্রাবাড়ী, কুতুবখালী, চকবাজার, মিরপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শত শত গ্যারেজ গড়ে উঠেছে। তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ফুটপাত দখল করে গ্যারেজ তৈরি হয়েছে। দিনে বাণিজ্যিক মিটার ব্যবহার করলেও রাতে চোরাই বিদ্যুৎ চলে। মানিকনগরের এক গ্যারেজ মালিক মেহেদি বলেন, “অন্য যানবাহন যেভাবে চলছে, আমাদের রিকশাও সেভাবে চলতে দেওয়া উচিত। সরকার নীতিমালা করে দিলে সমস্যা হবে না।”
অপরদিকে, মিরপুরের বাসিন্দা সোহাগ মিয়া বলেন, “এই রিকশাগুলো এখন সড়কের আতঙ্ক। চালকদের বয়স কম, অভিজ্ঞতা নেই, ট্রাফিক আইন বোঝে না। ফাঁকা পেলেই বেপরোয়া গতিতে ছোটে। এদের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।”
পুলিশের দাবি, অবৈধ রিকশার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। প্রধান সড়কে উঠতে বাধা, ডাম্পিং, সিট জব্দ ও কেবল লাইন বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান বলেন, “অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সবাই কাজ করছে। অল্প সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন ও ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষের কাছে এখনও সঠিক সংখ্যা বা বিদ্যুৎ খরচের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। অভিযোগ রয়েছে, ডিপিডিসির কিছু কর্মকর্তা অবৈধ সংযোগ দিয়ে আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন। ফলে অভিযানও দৃশ্যমান হয় না।
এই সমস্যা শুধু যানজট ও দুর্ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি নগরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং সড়ক নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং দুর্বল আইন প্রয়োগের কারণে এ ধরনের অবৈধ ব্যবসা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু অভিযান নয়, বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করে এ সমস্যার মূলোৎপাটন করতে হবে।
১৪ মে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক থেকে কী ধরনের সিদ্ধান্ত আসে, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে রাজধানীবাসী। যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে পারে। অন্যথায় নগরজীবন আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে। সড়কের এই নৈরাজ্য যত দ্রুত সম্ভব নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে, যানজট, দুর্ঘটনা ও বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।


