
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : কক্সবাজার, বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখল, ভাসমান দোকানপাট ও অস্থায়ী স্থাপনার কারণে তার সৌন্দর্য ম্লান হয়ে পড়েছিল। পর্যটকদের অভিযোগ ছিল, বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা ঝুপড়ি দোকান, চায়ের স্টল ও অন্যান্য স্থাপনা সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করছে এবং পরিবেশের ক্ষতি করছে। এ অবস্থায় সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সরাসরি নির্দেশনায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকে অবৈধ স্থাপনামুক্ত করার অভিযান শুরু হয়েছে, যা পর্যটন শিল্পের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ৯ মার্চ কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এক সপ্তাহের মধ্যে সৈকতের বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা সব অবৈধ ও অস্থায়ী স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, সৈকতকে রোহিঙ্গা বস্তির মতো গড়ে তোলা যাবে না এবং কোনো ধরনের অবৈধ স্থাপনা রাখা হবে না। এ নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন দ্রুত অভিযান শুরু করে। প্রথম দিকে মাইকিং করে ব্যবসায়ীদের স্বেচ্ছায় স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু অনেকে তা না করায় প্রশাসন বুলডোজার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় উচ্ছেদ অভিযান চালায়।
সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট, কলাতলীসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৫০০-এরও বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিছু সূত্রে জানা গেছে, তিন দিনের মধ্যে প্রায় ৬৩০টি দোকানপাট ও ঝুপড়ি সরানো হয়েছে। এর মধ্যে ভাসমান দোকান, চায়ের স্টল, খাবারের দোকান ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। উচ্ছেদ অভিযানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে ২২ মার্চ বিকেলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে সুগন্ধা পয়েন্টে যান। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে কোনো স্থাপনা থাকবে না। বালিয়াড়ি সম্পূর্ণ খালি রাখা হবে।” তিনি আরও জানান, উচ্ছেদ অভিযান পর্যায়ক্রমে নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পুরো সৈকতজুড়ে চলবে।
এ অভিযানে প্রকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের প্রতি সংবেদনশীলতা দেখানো হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে, যারা সত্যিকারের ছোট ব্যবসায়ী এবং অবৈধভাবে স্থাপনা গড়েননি, তাদের যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। এ লক্ষ্যে সম্ভাব্য পুনর্বাসন স্থান পরিদর্শনও শুরু হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে, যদিও অনেকে প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
পর্যটকদের জন্য এ উদ্যোগ অত্যন্ত স্বাগতজনক। দীর্ঘদিন ধরে তারা অবৈধ দখলের কারণে সৈকতে স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারেননি। বালিয়াড়িতে দোকানপাটের ভিড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। এখন উচ্ছেদের পর সৈকতের বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি খালি হয়ে আসছে, যা পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় ও আরামদায়ক অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন হলে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে নতুন করে উঠে আসতে পারে। পরিবেশ সংরক্ষণ, সৈকতের সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা—সবকিছুতেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—পুরো সৈকত অবৈধ স্থাপনামুক্ত হতে কতদিন লাগবে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী অভিযান পর্যায়ক্রমে চলছে এবং শিগগিরই নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত পুরো এলাকা কভার করা হবে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে, তাহলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পর্যটকরা একটি পরিচ্ছন্ন, দখলমুক্ত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত উপভোগ করতে পারবেন।
এ উদ্যোগ সরকারের পর্যটন বান্ধব নীতির প্রতিফলন। পর্যটকরা এখন আশাবাদী যে, শিগগিরই তারা সেই কক্সবাজার পাবেন যা শুধু দীর্ঘতম নয়, সবচেয়ে সুন্দর ও পরিচ্ছন্নও।



