০১/০৫/২০২৬
১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইতালির উপকূলে এখনো যেসব সৈকত সবার জন্য খোলা, প্রকৃতির মতোই খাঁটি

কোপাকাবানা সমুদ্র সৈকত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ইতালির উপকূল মানেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সারি সারি বেসরকারি বিচ ক্লাব, রঙিন ছাতা আর নির্দিষ্ট ফি দিয়ে ঢোকার ব্যবস্থা। বাস্তবতা হলো, দেশটির দীর্ঘ উপকূলজুড়েই আজ ব্যক্তিগত মালিকানাধীন সৈকতের আধিপত্য। তবু এই ভিড়ের মাঝেও এখনো কিছু জায়গা আছে, যেখানে প্রকৃতি নিজের মতোই আছে—খোলা, নির্ভেজাল এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। ইতালিতে বসবাসরত একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিকের অভিজ্ঞতা থেকে বাছাই করা এমন ছয়টি সৈকতের গল্প তুলে ধরা হলো এখানে, যেগুলো পর্যটনের চাপ এড়িয়ে আজও নিজের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে।

ইতালির মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত মার্কে অঞ্চল অনেকের কাছে এখনো আড়ালে থাকা এক রত্ন। বিশেষ করে সিরোলো ও পোর্তোনোভো ঘিরে থাকা উপকূলীয় এলাকা গণপর্যটনের চাপে পড়ে যায়নি। পাইন গাছ আর চুনাপাথরের পাহাড়ে ঘেরা এই সৈকতগুলোর নীল-সবুজ স্বচ্ছ পানি আর সাদা নুড়ি পাথরের দৃশ্য প্রথম দেখাতেই মন কাড়ে। সিরোলো সৈকতটি দীর্ঘ, খোলা এবং প্রাকৃতিকভাবেই সাজানো। পাশেই পোর্তোনোভো বে, যেখানে ষাটের দশকের এক ধরনের শান্ত, অলস ইতালীয় আবহ এখনো টিকে আছে। এই এলাকায় ১৯৫০ সাল থেকে চালু একটি ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁয় বসে ঝিনুক দিয়ে তৈরি স্প্যাগেটি খাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই স্মরণীয় হয়ে থাকে। থাকার জন্য সিরোলোতে ছোট আকারের বুটিক হোটেল ও স্পা থাকলেও পরিবেশ মোটেই কোলাহলপূর্ণ নয়।

দক্ষিণ ইতালির পুগলিয়া অঞ্চল সাধারণত পর্যটকদের কাছে বেশ পরিচিত। তবে এই অঞ্চলের উত্তর অংশে অবস্থিত গারগানো উপদ্বীপ এখনো তুলনামূলকভাবে নিরিবিলি। গারগানো ন্যাশনাল পার্কের অন্তর্ভুক্ত এই এলাকা পাথুরে খাঁড়ি, জলপাই বাগান আর উঁচু চুনাপাথরের পাহাড়ে ঘেরা। এখানে ছোট ছোট সৈকত আছে, যেগুলোর অনেকটাই মূল সড়ক থেকে দূরে। পোর্তোগ্রেকো নামের একটি ছোট সৈকত সমুদ্রগুহায় ঘেরা, যা ডাইভিং ও স্নরকেলিংয়ের জন্য আদর্শ। অন্যদিকে ভিগনানোতিকা সৈকতের পেছনের বিশাল পাহাড় বিকেলের রোদ থেকেও স্বস্তির ছায়া দেয়। এখানে আধুনিক অবকাঠামোর চেয়ে প্রকৃতির উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ে।

রোম শহরের কাছাকাছি অবস্থিত দ্বীপ পোনজা দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয়দের প্রিয় অবকাশযাপন কেন্দ্র। মূল ভূখণ্ড থেকে ফেরিতে করে সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়। দ্বীপটির সবচেয়ে বড় সৈকত ফ্রনতোনে যেতে হয় ওয়াটার ট্যাক্সিতে, যা ভ্রমণটাকেই আলাদা রোমাঞ্চে ভরিয়ে তোলে। কিছু সৈকত, যেমন চিয়াইয়া দি লুনা, কেবল নৌকা ভাড়া করেই দেখা সম্ভব। পোনজার সৌন্দর্য শুধু সৈকতেই সীমাবদ্ধ নয়; খাবারের ক্ষেত্রেও দ্বীপটি আলাদা পরিচিত। স্থানীয় একটি রেস্তোরাঁয় অক্টোপাস স্টু কিংবা টাটকা ডুমুরের মিষ্টান্ন অনেক ভ্রমণকারীর তালিকায় শীর্ষে থাকে। এখানে থাকা-খাওয়ার খরচ তুলনামূলক বেশি হলেও অভিজ্ঞতাটি বেশ আলাদা।

আরও দক্ষিণে, মূল ইতালি থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ হলো পান্তেলেরিয়া। ভৌগোলিকভাবে এটি সিসিলির চেয়ে তিউনিসিয়ার কাছাকাছি। এখানে কোনো বালুকাময় সৈকত নেই—এই দ্বীপের পরিচয় গড়ে উঠেছে আগ্নেয় শিলা আর খোলা সমুদ্রকে ঘিরে। স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকরা পাথরের ওপর তোয়ালে পেতে রোদ পোহান এবং সরাসরি গভীর নীল পানিতে নেমে পড়েন। বালাতা দেই তুর্কি এলাকা স্নরকেলিংয়ের জন্য জনপ্রিয়। পাশাপাশি লাগেত্তো দেলে অনদিনে নামের একটি প্রাকৃতিক জলাধার আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত পাথরের মাঝে শান্ত এক সুইমিং পুলের মতো অনুভূতি দেয়। আধুনিক রিসোর্ট কম, প্রকৃতির উপস্থিতি প্রবল।

ইতালির পশ্চিম উপকূলে টাস্কান দ্বীপপুঞ্জের অংশ এলবা দ্বীপটি ইতিহাস আর প্রকৃতির মিশেলে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। ইতালির বাইরে এটি খুব বেশি পরিচিত না হলেও দ্বীপটির প্রায় ৯০ মাইল দীর্ঘ উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট, বুনো সৈকত। নিস্পোর্তো নামের একটি সৈকত শান্ত পরিবেশ আর স্বচ্ছ পানির জন্য পরিবার নিয়ে ভ্রমণের উপযোগী। এখানকার পানির নিচে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য দেখার জন্য স্নরকেলিং বেশ জনপ্রিয়। বড় বড় বিচ ক্লাব না থাকায় এলবার অনেক সৈকতেই প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাওয়া যায়।

টাস্কানির মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত মারেম্মা অঞ্চলটি পুরোপুরি ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। গ্রোসেটো শহরের কাছেই মারেম্মার আঞ্চলিক পার্ক, যেখানে সৈকত মানেই খোলা প্রান্তর। এখানে নেই ছাতা, বার বা বেসরকারি ক্লাব। বালুকাময় সৈকতে পড়ে থাকা কাঠ দিয়ে বানানো ছোট অস্থায়ী ছাউনি ছাড়া মানুষের ছোঁয়া খুব কমই চোখে পড়ে। মেরিনা দি আলবেরেসে সৈকতটি সবচেয়ে জনপ্রিয় হলেও এখানেও ভিড় নিয়ন্ত্রিত। অনেক পর্যটক সাইকেল ভাড়া করে বুনো ঘোড়া আর মারেম্মা অঞ্চলের গরু দেখতে দেখতে সৈকত ঘুরে বেড়ান। স্থানীয় ডেইরি ফার্মের মহিষের দুধের মোজারেলা চিজ এখানকার আরেকটি পরিচিত আকর্ষণ।

সব মিলিয়ে, ইতালির উপকূল মানেই যে কেবল ব্যক্তিগত সৈকত আর ভাড়া করা ছাতার গল্প—তা নয়। একটু খোঁজ নিলেই এমন অনেক জায়গা পাওয়া যায়, যেখানে প্রকৃতি এখনো মানুষের শর্তে বাঁধা পড়েনি। এই ছয়টি সৈকত তারই প্রমাণ।

Read Previous

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বোয়িং-এর সাথে ১৪টি উড়োজাহাজ ক্রয়ে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে

Read Next

বিশ্ব মে দিবসে কেমন কাটছে বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রিক শ্রমিক ও কর্মীদের জীবন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular