
সুন্দরবন, ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারী এলাকায় সুন্দরবনের ভেতরে নৌভ্রমণে গিয়ে বনদস্যুদের হাতে এক রিসোর্ট মালিক ও দুই পর্যটক অপহৃত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার দুপুরে এই ঘটনা ঘটলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে শনিবার সন্ধ্যায়। অপহৃত ব্যক্তিদের উদ্ধারে কোস্টগার্ড, পুলিশ, নৌপুলিশ ও বন বিভাগ যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঢাংমারী এলাকার গোলকানন নামের একটি রিসোর্টে ঢাকা থেকে আসা পাঁচজন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। শুক্রবার দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে রিসোর্টের মালিক শ্রীপতি বাছাড়সহ মোট সাতজন একটি ডিঙিনৌকায় করে সুন্দরবনের খালের ভেতরে ভ্রমণে বের হন। নৌকাটি চাঁদপাই রেঞ্জের ঢাংমারী স্টেশনের আওতাধীন ঘাগরামারী টহল ফাঁড়ির কাছাকাছি কেনুয়ার খালে পৌঁছালে সেখানে আগে থেকে ওত পেতে থাকা একটি বনদস্যু দল তাঁদের পথরোধ করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ‘মাসুম বাহিনী’ নামে পরিচিত একটি সশস্ত্র দল নৌকায় থাকা ব্যক্তিদের মারধর করে তিনজনকে জোরপূর্বক অপহরণ করে গভীর বনের দিকে নিয়ে যায়। অপহৃতরা হলেন রিসোর্টের মালিক শ্রীপতি বাছাড় এবং দুই পর্যটক মো. সোহেল ও জনি। এ সময় নৌকায় থাকা অপর একজন কর্মী ও দুই নারী পর্যটককে শারীরিকভাবে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেওয়া হয়। ঘটনার পর তাঁরা কোনোমতে নিরাপদ স্থানে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
অপহরণের পরপরই বনদস্যুরা অপহৃতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করেছে বলে জানা গেছে। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে মুক্তিপণের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। অপহৃত রিসোর্ট মালিকের ছোট ভাই উত্তম বাছাড় জানান, পরিবার চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (আরওএএস) এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অপহৃতদের উদ্ধারে সংগঠনের পক্ষ থেকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, গোলকানন রিসোর্টটি একটি এনজিওর অর্থায়নে নির্মিত এবং স্থানীয়দের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও এটি তাঁদের সংগঠনের সদস্য নয়। তবুও সুন্দরবনের পর্যটন নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁরা ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাসুম বাহিনী তুলনামূলকভাবে নতুন একটি বনদস্যু দল। দলের সদস্যদের অধিকাংশই তরুণ এবং তারা সম্প্রতি সুন্দরবনের এই এলাকায় সক্রিয় হয়েছে। বাহিনীর প্রধান মাসুমের নানাবাড়ি দাকোপ উপজেলার লাউডোপ এলাকায় বলে জানা গেছে। স্থানীয়রা আরও জানান, পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে একই রিসোর্ট মালিক শ্রীপতি বাছাড়কে একবার অপহরণ করা হয়েছিল। সে সময় প্রায় এক লাখ সত্তর হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে আনা হলেও ঘটনাটি তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়নি।
দাকোপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান জানান, অপহৃত তিনজনকে উদ্ধারে থানা পুলিশ, নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে ও সন্দেহভাজন এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে। তিনি বলেন, বনদস্যুদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং দ্রুত অপহৃতদের নিরাপদে উদ্ধার করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
এই ঘটনার পর সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন নিয়ে নতুন করে নিরাপত্তা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। তারা সুন্দরবনে নৌভ্রমণের সময় টহল জোরদার করা এবং পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট নিরাপত্তা নির্দেশনা কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।



